ভ্রমণ

রূপসী পুরুলিয়া – পিয়ালী দে মিত্র

সিরিজঃ ভ্রমণ ব্রহ্মাণ্ড 2.0
সম্পাদনাঃ অমরজিৎ মণ্ডল

কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা হঠাৎ মনে পরে গেল। রূপসী বাংলা। সত্যিই আমাদের এই বাংলাতে এত অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য ছড়িয়ে যে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হয় না।

তাই মন চায় বাংলার প্রকৃতিকে মনের চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখি।

পুরুলিয়া, নামটা আমাদের সবারই খুব চেনা। এই নামটা বললেই মনে পরে যায় সেই ছৌ নাচের কথা। যা বাংলার পৌরাণিক ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। তাছাড়াও পুরুলিয়া জেলার বিশেষ আকর্ষণ হল পাহাড়ি সৌন্দর্য। আপনারা ঠিকই ধরেছেন আমি অযোধ্যা পাহাড়ের কথাই বলছি। তাই এবারে শীতে ভ্রমণ প্রিয় বাঙালী বাংলার পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পুরুলিয়ার কাছাকাছি যেতেই দেখতে পেলাম পথের দু’ধারে মণি মাণিকের মত ছড়িয়ে আছে অনেক অনেক ছোট বড় নুড়ি পাথর। দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। রাঙা পলাশের সাথে সূর্যাস্তের রক্তিমাভা যেন মিলে মিশে এক হয়ে গেছে।

পুরুলিয়া পৌঁছলাম রাত ৮টায়। আমরা কোনো হোটেল বুক করে রাখিনি। অনেক হোটেল। তাই রাতে থাকার কোনো অসুবিধা হয়নি। ওখানে অনেক রেস্টুরেন্টও আছে। ভোজন রসিক বাঙালী। গরম গরম বিরিয়ানি দিয়েই নৈশভোজ সারলাম।

পরের দিন সকাল ৮টায় রেডি হয়ে গরম গরম কচুরি দিয়ে প্রাতরাশ সেরেই বেরিয়ে পড়লাম অযোধ্যা পাহাড়ের উদ্দেশে। পুরুলিয়া থেকে অযোধ্যা পাহাড় ৪০ কিলোমিটার। এক ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। অভিভূত হয়ে গেলাম দূরে পাহাড়ের কোলে সরিষা ক্ষেতের হলুদ ফুল দেখে।

পৌঁছে গেলাম একেবারে অযোধ্যা পাহাড়ের সামনে। মন বলে উঠল “মৌন তুমি স্তব্ধমুখর তবু মনের কথা কও”। কল্পনাই করতে পারিনি বাংলায় এত সুন্দর পাহাড়ে ঘেরা একালা আছে। তার পাশ দিয়ে চলে গেলাম আরও পাহাড়ের উপর। যেতে যেতে দেখতে পেলাম আপার ড্যাম। এই ড্যামের জল খুব স্বচ্ছ ঘন নীল। মন কেড়ে নেয়। পাহাড়ের কোলে ড্যাম গুলো দেখে মনে হচ্ছিল পাহাড় যেন বুক দিয়ে আগলে রেখেছে এদের। মন ভরে গেল। চলে এলাম বাহমনী ঝর্ণার ডাকে। দূর থেকেই পাথরের বুকের উপর জলধারা আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। দৌড়ে গেলাম তার ডাকে সাড়া দিতে। পাহাড়ের বুক চিড়ে যেন আনন্দ অশ্রু বয়ে চলেছে। সেই বারি ধারা দেখে মনে পুলক জেগে উঠল । তবে ঝর্ণা দেখার সময় অনেক সিঁড়ি ভাঙতে হয়েছিল। মাঝে মাঝে একটু দাঁড়িয়ে আবার নিচে নামা। সিঁড়ির মাঝে কিছু ঠাণ্ডা পানীয়ের দোকান আছে। ক্লান্ত পথিকের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য। অনেকেই আবার একটু গা ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন ঝর্ণার জলে। গেলাম ঠুরনা ঝর্ণার কাছে। আমার মনকে ভিজিয়ে দিল সে। এই ঝর্ণার কাছে যাওয়ার কোনো পাহাড়ি রাস্তা ছিল না। দূর থেকেই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করলাম। এরপর গেলাম পিতিধিরি ও ঘাঘেশ্বরী ঝর্ণা দেখতে। তাদেরও এক অপূর্ব রূপ। সেই জলধারায় মনের তৃষ্ণা নিবারণ হল। একটি পাহাড়ে এত দর্শনীয় স্থান ভাবা যায় না।

রামমন্দির দর্শন করলাম। পাহাড়ের উপর এমন সুন্দর মন্দির অকল্পনীয়। পাহাড়ের একদম চূড়ায় হনুমানজীর মন্দির। ওখানেই কিছু বাচ্চাদের দেখানো রাস্তা ধরে চলে গেলাম একটি কুয়োর জলের ধারে। নাম সীতাকুণ্ড। এই কুয়োর জলের মাঝখানটা সবসময় গরম জলের মতো ফুটতে থাকে। লোহারিয়া বাবার শিব মন্দিরও দেখলাম। মাথা তুলে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে গর্গাবুরু। অযোধ্যার উচ্চতম শৃঙ্গ। উচ্চতা ৬৭৭ মিটার।

হঠাৎ দূরে শুনতে পেলাম মাদল বাজার শব্দ। মন মাতাল হয়ে উঠল সেই শব্দে। জানতে পারলাম এটাই সেই বিখ্যাত ছৌ নাচের গ্রাম। এবার ছুটে চললাম সেই নাচের টানে। কিছু অভাবনীয় জিনিস দেখলাম। নাচের বিখ্যাত মুখোশ কিভাবে তৈরি হয় সেটাও দেখার সৌভাগ্য হল। তবে তার বর্ণনা এখানে দেব না। তারপর শুরু হল সেই বিখ্যাত ছৌ নাচ। ওদের নাচের তালে আলে আমাদের পা-ও দুলে উঠল। স্বাভাবিকভাবেই।

এখানে প্রায় ২৪ রকমের দর্শনীয় স্থান আছে। আমি ভাবতেই পারছিলাম না একটা পাহাড়ের এত অপূর্ব রূপ বৈচিত্র হয় কি করে! এখানে পাহাড়ের উপরেই কয়েক হাজার দরিদ্র পরিবারের বাস। ওই পাথুরে জমিতেই ওরা আখ চাষ করে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ওরা জানতো ও না বিদ্যুৎ সংযোগ কি!

পাহাড়ের কোলে সূর্য উদয় ও সূর্য অস্ত দেখতে খুব সুন্দর লাগে। যদিও আমার সেখানে সূর্য উদয় দেখার অবকাশ হয়নি। তবে সূর্যাস্তের লাল আভা পাহাড়ের গায়ে যে অপূর্ব রূপ মাধুরী সৃষ্টি করল তা দেখা থেকে বঞ্চিত হইনি।

আরও পড়ুন >> কেদারনাথের পথে >>

Facebook Comments

You Might Also Like