ভ্রমণ

জলসাঘরে কিছুক্ষণ – উত্তরণ ব্যানার্জ্জী

সিরিজঃ ভ্রমণ ব্রহ্মাণ্ড 2.0
সম্পাদনাঃ অমরজিৎ মণ্ডল

নিমতিতা, মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গার তীরবর্তী একটা গ্রাম। তার থেকে চার কিলোমিটার দূরে আর একটা গ্রাম দহড়পাড়, সেখানে আমরা ছোট থেকে বড় হওয়া এবং পাঁচ মাস নিমতিতা গৌরসুন্দর দ্বারকানাথ বিদ্যায়তনে শিক্ষকতা ও করেছিলাম কিন্তু নিমতিতা রাজবাড়ি তথা জমিদার বাড়িকে কখনোই দর্শনীয় স্থান হিসেবে ঘোরার সুযোগ বা ইচ্ছা কোনোটাই হয়নি। যদিও শুনেছিলাম ওই গৌরসুন্দর এবং দ্বারকানাথ চৌধুরী যাঁদের নামে আমার প্রথম কর্মস্থলের নাম, তাঁদের হাতেই তৈরি হয় নিমতিতা রাজবাড়ি।

এখন আমি ধানবাদে কর্মরত। একদিন আমার মেসের এক বন্ধুর সাথে মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন গুলো নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে নিমতিতা রাজবাড়ী কথা আসে। সেই প্রসঙ্গে আমিও বলেছিলাম যে এই নিমতিতার প্রতিবেশী গ্রামেই আমার বাড়ি। নিমতিতা রাজবাড়ী সম্বন্ধে তার একটা কৌতূহল লক্ষ্য করেছিলাম সেদিন। আর তার থেকেই আমারও ইচ্ছা জাগে রাজবাড়ির সঙ্গে ভালো করে পরিচিত হওয়ার। তারপর শীতকালীন অবকাশে ধানবাদ থেকে বনাঞ্চল এক্সপ্রেসে পৌঁছোলাম পাকুড়, সেখান থেকে আমার বাড়ি। একদিন বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন গিয়েছিলাম নিমতিতা রাজবাড়ি ভ্রমণে। আজ আমাদের ভ্রমণ স্থল নিমতিতা রাজবাড়ি।

এই রাজবাড়ীর সাথে বাঙ্গালীর বিশেষ পরিচয় ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রের সৌজন্যে। দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে ৩৪-নং জাতীয় সড়ক ধরে এগোলে সাজুর মোড় বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে নিমতিতা রাজবাড়ি। আমার মোটর সাইকেলে গিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। রাজবাড়ির পাশের ছোট বাগানে বাইক থামিয়ে যেই নেমেছি, চোখ পড়ল একটা পুরোনো গাড়ির দিকে, একটু এগিয়ে গেলাম গাড়িটার দিকে। দেখলাম হুডলেস একটা জিপের মতন যেগুলো সেকালে ব্যবহার করতেন জমিদাররা, গাড়ির সর্বাঙ্গে মরিচা, ভগ্নদেহ লতা-পাতাময়, ইঞ্জিনের বেশিরভাগ অংশই শেষ কিন্তু চাকাগুলো বেশ ভালোই আছে। এত অযত্নে পড়ে থাকা গাড়িটার সম্বন্ধে জানার ইচ্ছা হল। এক ভদ্রলোক পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম গাড়িটার সম্বন্ধে, তিনি যা বললেন তাতে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না, বললেন ‘গাড়িটা বিখ্যাত বিদেশি কোম্পানির গাড়ি যেটা জমিদার পরিবারে সদস্যরা ব্যবহার করতেন, আর এই গাড়িতে চড়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই বাড়িতে বরযাত্রী এসেছিলেন’। কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, এত বড় স্মৃতির কি অবহেলা। তারপর আমার রাজবাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম।

একটু এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে ঘুরলেই রাজবাড়ির সদর দরজা। বাইরে থেকে রাজবাড়ি দেখে মনে হল বড় বড় স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে জরাজীর্ণ ইতিহাস। উপর দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাড়ির বেশিরভাগ অংশই অধিকার করেছে বিভিন্ন লতানো গাছ, ঘাস আর জংলী গাছপালা। তারপর প্রবেশ দুয়ারের দিকে পা বাড়ালাম, প্রবেশ দুয়ার পৌঁছানোর আগে ডান ও বাম দিকে খোলা বারান্দা, দেখে আন্দাজ করলাম সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন জমিদার পরিবারের সদস্যরা।

একটু এগিয়ে দেখলাম দু-পাল্লা কাঠের দরজা তাতে কি সুন্দর কারুকার্য কিন্তু দরজা তালাবন্ধ, আমার স্থানীয় এক ভদ্রলোকের কাছে জানতে পারলাম ওই সময় সদর দিয়ে প্রবেশ সম্ভব নয়। আর জানলাম যারা রাজবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তারা বাড়ির পেছন দিকে থাকেন, প্রবেশ অনুমতি তারাই দিতে পারেন। আমার গেলাম বাড়ির পেছনে দিকে, আমাদের দেখে বেক্ষণ কর্তার যে প্রতিক্রিয়া তাতে স্পষ্ট যে আমার হয়ত অধিগ্রহণ করিতে গিয়েছি রাজবাড়ি। অনেক অনুরোধের পর খুব অল্প সময়ের জন্য আমাদেরকে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন। আর আমাদের সঙ্গে দিলেন বছর তিরিশের এক স্থানীয় যুবককে। আমার একটা অন্য দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম।

তারপর এক এক করে মনে পড়তে লাগলো জলসাঘর চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্যগুলো আর স্মৃতির সাথে মিলিয়ে নিতে লাগলাম চোখের সামনের জলসাঘরকে। দেখলাম দেওয়াল, মেঝে, ছাদ সবেরই করুন ভগ্ন দশা। মাকড়সার জাল, ঝুল সর্বাঙ্গ নিয়ে এ এক অন্য জলসাঘর। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলাম ভগ্নপ্রায় সিঁড়ি অতি আতঙ্কের আর অসংখ্য বাদুড়, কষ্ট করে দ্বিতলে উঠে কতকগুলো ঘর ঘুরে দেখলাম। রাজবাড়িকে মনে হল অলংকারহীন রাজকন্যা। বেশিরভাগ অংশই উদ্ভিদ দ্বারা শাসিত। আর একটু এদিক ওদিক ঘুরে নিচে নেমে এলাম।

এবার আমাদের চোখে গেল যে অংশে তা বাড়ির অন্য অংশ তুলনায় একটু ভালো অবস্থায় ছিল। আমাদের সঙ্গে থাকা যুবকের কাছে জানতে পারলাম ওটা রাজবাড়ির ঠাকুর দালান, সেখান এখনো পুরানো রীতি অনুযায়ী একচালার দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে শারদীয় বন্দনা হয়, তবে পুরানো গৌরব আর নেই। আরও জানলাম সদর দরজাটাও পূজার সময় একমাত্র খোলা থাকে। তারপর আর একটু এদিক ওদিক ঘুরে রাজবাড়ির বাইরে এলাম।

এবার আমার রাজবাড়ির কোল ঘেঁষে প্রবাহিত ভাগীরথী দর্শন করতে এগিয়ে গেলাম, পথে বাধা দিলেন দুই বিএসএফ জওয়ান, বললেন “সামনে বাংলাদেশ সীমান্ত, তাই এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি নাই”। একটু অনুরোধ করতেই শর্তসাপেক্ষ দশ মিনিটের জন্য আগে যাবার অনুমতি দিলেন তাঁরা। এগিয়ে যেতেই একটা চড় চোখে পড়ল, আর দেখলাম গঙ্গা যেন দুই ভাগ হয়ে গেছে। এক মাঝিভাই কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, “গঙ্গা ওখানে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, একটা ভাগ পদ্মা নাম নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, দ্বিতীয়টা ভাগীরথী যার সামনে আমরা দাঁড়িয়ে”। গুগল ম্যাপ খুলে দেখেছিলাম সত্যি দূরে আবছা দেখতে পাওয়া ঘরবাড়ি গুলো বাংলাদেশ, আর জলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে দুই বাংলা তথা ভারত – বাংলাদেশের বিভাজন রেখা। এক অনন্য অনুভূতি অনুভব করেছিলাম।

এরপর জাওয়ানদের ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ি ফেরার জন্যে বাইকে চড়ে বসলাম। কবির কটা লাইন মনে পরছিল খুব 

“বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে 
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে,
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা 
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া 
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের ওপর,
একটি ‌শিশিরবিন্দু”।

কালের নিয়মে হারিয়ে ফেলেছে যৌবন তবু হাড় কঙ্কাল সার রাজবাড়ি আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের বহু তথ্যের সাক্ষী হয়ে।

আরও পড়ুন >> কুমায়ুন হিমালয়ের অন্যরূপ >>

Facebook Comments

You Might Also Like