পাহাড় ভ্রমণ

কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ১/৩ – মিলি ঘোষ

সিরিজঃ ভ্রমণ ব্রহ্মাণ্ড 2.0
সম্পাদনাঃ অমরজিৎ মণ্ডল

শুনেছিলাম কেদার শৃঙ্গ থেকে পূর্ণচন্দ্রের শোভা দেখা, সে নাকি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা! তাই এবারে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতিটাই ছিল অন্যরকম। পাঁচমাস পরে ঠিক পূর্ণিমার দিনটিতে যেন আমরা কেদারনাথ পৌঁছতে পারি সেভাবেই, ট্রেনের টিকিট থেকে গাড়ির বুকিং সবকিছু করা হয়েছিল। টিকিট কাটার কয়েকমাস আগে থেকে সবার সঙ্গে কথা বলার পর কেদারযাত্রার জন্য মোটামুটি বারোজনের একটা দল তৈরী হল। আমার বাবা-মা, ভাই বিকাশ, বিকাশের শ্বশুরমশাই (এই কাকুই আমাদের দলের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য), দিদি কৃষ্ণাদি, বোন সুমা, ওর দশ বছর বয়সী ছেলে সবার আদরের গুড্ডু, গুড্ডুর বাবা জয় আর মাস্টারমশাই সুরজিৎ, আমার ছেলে (১৮) আর ওর বাবা, – মানস। বিশেষ অসুবিধার জন্য শেষমুহূর্তে মানসের জামাইবাবু, দুই দিদি আর ভাগ্নীদের টিকিট ক্যান্সেল করতে হয়েছিল।

 ৯ই অক্টোবর, হর হর মহাদেব নাম উচ্চারণ করতে করতে আমাদের যাত্রা শুরু করলাম, হাওড়া থেকে ১৩০০৯ দুন এক্সপ্রেসে, গন্তব্য কেদারনাথ। ট্রেন যথারীতি লেট, আমরা ১১ই অক্টোবর সকাল সাড়ে ন’টায় হরিদ্বার পৌঁছলাম। হোটেল আগে থেকে বুকিং ছিল, এক ঘন্টা অপেক্ষা করে রুম পেলাম। একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সোজা ‘হর কি পৌড়ি’ ঘাট। পতিতপাবনী মা গঙ্গায় ডুব দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। এই পবিত্র স্থানে স্নান করে নিজের শরীর, মন সব পবিত্র হয়ে গেলো। মা গঙ্গার কাছে কেদারনাথ যাবার অনুমতি নিয়ে এলাম। 

দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার গেলাম হর কি পৌড়ি ঘাট। এখানে মা গঙ্গার আরতি দেখা অনেকের কাছেই একটা প্রধান আকর্ষণ। ফুলের তৈরি দোনায় প্রদীপ জ্বালিয়ে মা গঙ্গায় ভাসানো হয়। হাজার হাজার প্রদীপের আলো, সুললিত স্ত্রোত্রপাঠে সে এক অসাধারণ দৃশ্য!

 ১২ই অক্টোবর থেকে আমাদের গাড়ি বুকিং ছিল। ঠিক সকাল সাতটায় যাত্রা শুরু করলাম সীতাপুর এর উদ্দেশ্যে। 

আমরা বারোজন সদস্য ছিলাম, তাই দুটো গাড়ি নেওয়া হয়েছে, একটা ইনোভা আরেকটা বোলেরো। হরিদ্বার থেকে ঋষিকেশের পথে সত্যনারায়ণ মন্দির পড়ল। সেখানে পুজো দিয়ে যেতে হয়, আমাদের ড্রাইভারবাবু নিয়ে গেলেন পথ দেখিয়ে। এর পর একটা ছোট জায়গায় গাড়ি দাঁড়ালো। সেখানেই সকালের জলখাবার, আলুপরোটা আর টক দই। গাড়ি যত এগোচ্ছে ততই জঙ্গল ঘন, আরো ঘন হয়ে যাচ্ছে, মন ভরে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে চলেছি.. অনেকটা পথ পেরিয়ে এলাম রাস্তায় একে একে পেরিয়ে এলাম লক্ষ্মণঝুলা, রামঝুলা, দেবপ্রয়াগ – এসব জায়গায় আগেও এসেছি, তাই বেশি সময় নষ্ট করলাম না, একটু দাঁড়িয়েই আবার এগিয়ে চললাম। 

গাড়ির গতি অনেকটা বেশি, রাস্তায় কোনো জ্যাম নেই। মাঝে মাঝে কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। 

বেলা প্রায় আড়াইটেয় শ্রীনগর ছাড়িয়ে একটা ছোট ধাবাতে দুপুরের খাবার খেলাম গরম গরম ভাত, রাজমা, আলুগোবি, মটরপনির, দই। এই তৃপ্তি শুধু গাড়োয়ালেই পাওয়া যায়! এখানের মানুষ কত সেবাপরায়ণ সেটা বোঝা যায় ওদের ব্যবহারে।

 একটু পরে আবার পথ চলা শুরু আমাদের সাথে সাথে অপরূপা মন্দাকিনীও চলেছে, কী যে তার সৌন্দর্য আমার পক্ষে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। 

 পাহাড়ের পথ ধরে যত এগোচ্ছি, প্রকৃতি যেন তত সুন্দর হয়ে উঠছে, এ সৌন্দর্য শুধু চোখ ভরে দেখার, ক্যামেরাতেও বুঝি সবকিছু বন্দি করা সম্ভব নয়!

 যেতে যেতে রুদ্রপ্রয়াগ, তিলবারা, অগস্ত্যমুনি, কুন্ড, গুপ্তকাশী, নালা (নারায়ণ কোঠি) ফাটা, রামপুর – এইসব জায়গার নাম পেলাম। অবশেষে রাত আটটার সময় পৌঁছলাম সীতাপুর। আজকের পথ চলা এখানেই শেষ। সীতাপুরের এই হোটেলই হবে আমাদের কেদারযাত্রার শেষ বেসক্যাম্প!

 হোটেলের নাম জগৎ রাজ, রাস্তার ওপর থেকে মনে হচ্ছে দোতলা, ভেতরে ঢুকে দেখি নিচে আরো তিনটে তলা আছে। প্রচুর ঘর, মাঝে চৌকোনা বড় উঠোন।

 পথেই ফোন করে বলে দিয়েছিলাম, ওনারা সেইমতো খাবার বানিয়ে রেখেছিলেন। রাতের খাবার সেরে, একটা ছোট্ট মিটিং, পরের দিন খুব ভোরে বেরোবার প্ল্যান। সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। 

 সীতাপুর ছোট্ট একটা গ্রাম। চারিদিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা আর হোটেলের পাশ দিয়ে মন্দাকিনী বয়ে চলেছে। হোটেলের রুম থেকে তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। এত সুন্দর পরিবেশ যে, মন ভালো হয়ে যাবেই । মাঝে মাঝে এ সবকিছুর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করে… 

জয় কেদারনাথের জয়! (ক্রমশঃ)

আরও পড়ুন >> কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ২/৩ >>

আরও পড়ুন >> সদ্য ঘুরে আসা ত্রিকুট পাহাড় – মৌসুমী ভৌমিক >>

Facebook Comments

You Might Also Like