পাহাড় ভ্রমণ

কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ৩/৩ – মিলি ঘোষ

সিরিজঃ ভ্রমণ ব্রহ্মাণ্ড 2.0
সম্পাদনাঃ অমরজিৎ মণ্ডল

পূর্ণিমার চাঁদ কেদারনাথ থেকে দেখবো, অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম… ঘন কালো মেঘ জমা হয়ে, আমার সেই স্বপ্নে সত্যিই যেন জল ঢেলে দিলো।

মনের দুঃখে এগিয়ে চললাম হোটেলের দিকে। পুরো ভিজে যাওয়াতে বুঝতে পারছি কাঁপুনি দিয়ে জ্বর চলে এসেছে। রুমে এসে একটা ওষুধ খেয়ে সোজা ডবল লেপের ভেতরে। হোটেলের রুম থেকে আরতির গান শোনা যাচ্ছে। 

বাবা, মা, কাকু আর মানস হেলিকপ্টারে আসার জন্য দুপুর একটা নাগাদ চলে আসে, ওরা খুব ভালোভাবে পুজো দিতে পেরেছে। তবে যতক্ষণ না অন্যরা পৌঁছতে পেরেছে ততক্ষন বয়স্কদের দলটা খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। এখন একসঙ্গে হতে পেরে আমরা সবাই খুব খুশি, সবাই ক্লান্ত হলেও মোটামুটি আছি। স্নো ফল হওয়াতে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রিতে নেমেছে, এখন সবাই রাতের খাবার খেয়ে নিজের নিজের লেপের তলায়, সবার কাছে কর্পূরের কোটো দিয়ে রেখেছি, বলেছি একটুও শ্বাসকষ্ট হলে যেন কর্পূর শোঁকে। আমি ওষুধ খেয়েও ঘুমোতে পারছি না, চাপা টেনশন কাজ করছে, সবাই যেন সুস্থ থাকে! অক্সিজেনের অভাবে কী হতে পারে, সেই ভয় কাজ করছিল। এতো বেশি ঠান্ডা ছিল যে অত মোটা মোটা দুটো করে লেপও ঠান্ডা আটকাতে পারছে না।

রাত বাড়ছে কিন্তু শান্তিতে ঘুমোতে পারছি না, রাত তখন প্রায় একটা, মাইকে মহাদেবের মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র শুরু হল, ঘর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শুনেছি এই সময় মন্দির খোলে, যেতে ইচ্ছে করলেও শরীর দিচ্ছে না। কিন্তু মন ব্যাকুল হয়ে রয়েছে কখন যাবো মন্দির। কেদার মন্দিরের এত কাছে একটা ঘরের মধ্যে আছি, মনে হচ্ছে সবটাই স্বপ্ন! তারপর ঠিক ভোর পাঁচটায় মন্দির থেকে ভজন শোনা যেতে লাগলো। এইসময় মহাদেবের স্নান পর্ব চলছে নিশ্চয়। আমরাও তাড়াতাড়ি চান করে রেডি হয়ে নিলাম, মন্দিরে যাওয়ার জন্য। বাবা, মা, কাকু আর মানস ছ’টার সময় বেরিয়ে পড়ল হেলিকপ্টার ধরার জন্য, সেই সময় হোটেল থেকে বেরিয়ে দেখি হোটেলের পেছনে বরফে ঢাকা কেদার শৃঙ্গ, সূর্যের আলোয় সোনালী আভা ছড়িয়ে পড়েছে। এই হোটেলটির নাম “ভেল আশ্রম হোটেল” হোটেলের চারিপাশে ছবছর আগেকার ধ্বংসের চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে কিছুই বোঝা যায়নি, এখন দেখে বোঝা যাচ্ছে কত বড় বড় পাথর পড়ে রয়েছে। অনেক হোটেলের অর্ধেক ভাগ নেই, শুধু ধ্বংসের ছবি, তারই মধ্যে মানুষ আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করেছে, তীর্থযাত্রীদেরও যতটুকু ক্ষমতা আছে সেই দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানকার পর্যটনকর্মীদের সব রকম ব্যবস্থা সেই সোনপ্রয়াগ থেকেই করতে হয়, এই লড়াইটা খুব সহজ লড়াই নয়, তাঁদের জন্যই তীর্থ যাত্রীরা ভালোভাবে যেতে পারছেন। এর মধ্যে সবাই তৈরি হয়ে গেছে, আমরা মন্দিরের দিকে এগোলাম।

মন্দিরে গিয়ে প্রথমেই পুজো দেবার থালি কিনে তাতে গাঁদা ফুলের মালা, টাটকা বেলপাতা, কর্পূর, পৈতে রাখা হল। হরিদ্বার থেকে নিয়ে এনেছিলাম ঘি, জল ঢালার জন্য তামার কলস। খালি পায়ে পুজো দেওয়ার লাইনে দাঁড়ালাম, মন্দিরের বাইরে ওই এক ঘন্টা খুবই কষ্টকর, পাথরের চাতাল যেমন ঠান্ডা আর তেমনি হওয়া বইছে, সাথে আমার আর বোনের যেটা হচ্ছিলো, মাথা ঘোরা আর শরীর যেন শক্তিহীন হয়ে পড়ছে, ভেবেছিলাম ভালো করে সব দেখে নেবো, কিন্তু পেরে উঠছি না, চেষ্টা করছি দু’চোখ ভরে দেখে নিই এই অপরূপ শোভা। মহাদেব এতো দূরে থাকেন তার কারণ মনে হয়, হয়তো খুব সহজে প্রসন্ন হন না, তাই ভক্তের ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণুতার পরীক্ষা নেন। 

লাইন আস্তে আস্তে এগোচ্ছে, এখন আমাদেরও সময় এল, ওঁম নমঃ শিবায়ঃ বলতে বলতে যাচ্ছি। মন্দিরের ভেতরে যেন এক অলৌকিক পরিবেশ! ঢোকার দরজায় গণেশজীর মূর্তি, তারপর বাঁ দিক দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্মী নারায়ণের মূর্তি, সোজা দ্রৌপদীর মূর্তি ডান দিকে পঞ্চপাণ্ডবের সাথে মাতা কুন্তীর মূর্তিও বিরাজমান। ঠিক মাঝে স্বর্ণ নন্দী, এরপর দ্বিতীয় দরজার ডান পাশে মা গৌরী। 

বাঁ দিকে গণেশ মূর্তি প্রণাম করে এগিয়ে চললাম। গর্ভগৃহের ভেতরটা শুধু প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে। মহাদেবের দর্শন মাত্র জীবনের সব চাওয়া পাওয়া যেন ভুলে গেলাম! কোনো অভিলাষ, কোনো বেদনা থাকলো না, মনে হল সব থেকে বেশি সুখ আর পরমানন্দের তৃপ্তি অনুভব করছি। জগৎ এর সব থেকে সুখী মানুষ আমি। মনে পড়ল অনেক আগে শোনা নর-নারায়ণের গল্প –

কেদারনাথ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম জ্যোতির্লিঙ্গ। শিব মহাপূরাণে কথিত আছে, কেদারনাথ হল মোক্ষের দ্বার। কেদারনাথ দর্শন করলে মোক্ষলাভ হয়। পর্বতরাজ হিমালয়ে কেদার শৃঙ্গ নামক স্থানে শ্রী বিষ্ণুর অবতার নর ও নারায়ণ বহু বহু বছর ধরে মহাদেবের তপস্যা করেন। মহাদেব তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দর্শন দেন আর মনের মতো বর চাইতে বলেন। 

নারায়ণ বললেন, হে করুণাসিন্ধু, হে দয়ানিধান, হে জগৎপিতা, হে দেবাদিদেব মহাদেব, এখানে আপনার উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব স্থাপন করুন। আপনার দর্শনে আমরা আজ যে সুখ ও পরমানন্দের তৃপ্তি অনুভব করছি, সেই তৃপ্তির অনুভব আপনার ভক্তরাও যেন পায়।

মহাদেব আশীর্বাদ দিয়ে বলেন, কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন মাত্র অলৌকিক ফল লাভ হবে, তার সাথে শিব ভক্তি সঞ্চারিত হবে! হর হর মহাদেব!!!

দর্শন করে এবার বিদায় নিয়ে চললাম, শুনেছি মহাদেবের কাছে কিছু চাইতে হলে, নন্দীর কানে কানে বলতে হয়। নন্দী স্বয়ং মহাদেবকে জানিয়ে দেন। আমরাও তাই করলাম। প্রসাদ গ্রহণ করে বেরিয়ে এলাম, বাইরের বড় নন্দীকে প্রণাম জানাতে। পুজোর পর চারিদিকে ভালো করে দেখে নিলাম। মন্দিরের ঠিক পেছনে বিশাল ভীমশিলার দর্শন হল। শোনা যায় ২০১৩ প্রলয় থেকে মন্দিরকে রক্ষা করেছে এই বিশালাকায় পাথর। এই স্থানের মাহাত্ম্য হল স্বয়ং মহাদেব নিজেই নিজের সৃষ্টির রক্ষাকর্তা। একটা কৌতূহল ছিল, কেদারনাথ মন্দিরের সঙ্গে পঞ্চপান্ডবেরই বা কী সম্পর্ক? আমার ছেলে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে বলল সেই গল্প,

প্রচলিত আছে, পঞ্চপাণ্ডবেরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্তির জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে চান, শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসারে হিমালয়ে অবস্থিত কেদারশৃঙ্গে মহাদেবের দর্শন পেতে যান।

কথিত আছে মহাদেব দর্শন দেবেন না বলে মহিষরূপ ধারণ করেন, কিন্তু ভীম মহিষরূপী মহাদেবকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরেন, আর মহাদেব ভূপৃষ্ঠে প্রবেশ করতে থাকেন, কিন্তু মহাবলী ভীম নিজের শক্তি দিয়ে কিছুটা আটকে দেন, তাই মহিষের পিঠের ভাগটা কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গে পূজিত হয়। এই মহিষরূপ পাঁচ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বাকি অংশ তুঙ্গনাথ, কল্পেশ্বর, রুদ্রনাথ, মাধ্যমহেশ্বরে পূজিত হয়। এটাই পঞ্চকেদার নামে বিখ্যাত।

কিছুক্ষন পরে, আমরা সবাই জল খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম ফেরার উদ্দেশ্যে। দেখলাম সেই পিটঠু ভাইটি আমাদের জন্য বসে ছিল সেখানে। এখন পনেরোশো টাকায় যাবে, তাই বোনের ছেলে দেবায়ন পিটঠুতে চেপেই চললো…  আমরা বেশ ক্লান্ত ছিলাম আর ভাবলেই ভয় করছে যে, আবার এতটা পথ পেরিয়ে যেতে হবে, শরীর খুব খারাপ, হাঁটার ক্ষমতা পাচ্ছি না, তাই একটু চেষ্টা করলাম যদি হেলিকপ্টারের টিকিট পাওয়া যায়, সব কোম্পানি গুলোতে গিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু কোনো লাভ হল না। শেষে জয় কেদার বলে হাঁটা শুরু করলাম। 

শরীর খারাপ লাগছে, সাথে মাথা যন্ত্রণা! কিছুটা হাঁটার পর, আমি আর বোন স্বামী বিবেকানন্দের নামে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র আছে দেখে সেখানে গেলাম, আমাদের ফ্রি চেক আপ করে ওষুধ দেওয়া হল, ওনারা বললেন এটা উচ্চতাজনিত সমস্যা, সবারই হয়। এরপর একটু রেস্ট নিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। অনেক জায়গায় ঢালু হওয়ায় পুরো বডিওয়েট পায়ে নিতে হচ্ছে। কখনো কখনো শর্টকাট করে নামার চেষ্টা করছি। সব থেকে বাজে ব্যাপার হচ্ছিল যখন পাহাড়ে বৃষ্টি নামছিল, কোথাও কোনো মাথা গোঁজার ঠাই নেই, ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে। আমার ছেলে আর দিদি অনেকটা এগিয়ে গেছে। কারোর কাছে রেইনকোট, ছাতা কিছু নেই। সবাই ভিজতে ভিজতে চলেছি।

আমরা সবার পেছনে ছিলাম। যতটা সম্ভব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে এতটা ঢালু যে, গড়িয়ে যাওয়ার ভয় আছে। বড়ি লিঞ্চোলিতে অনেক ছোট বড় খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, আমরা আলুপরোটা আর আচার দিয়ে জলখাবার খেলাম। যেতে যেতে দেখা হয়ে গেল সেই মা ও নয় বছরের মেয়ের সাথে, তারা আর উঠেতে না পেরে এখানে রাত কাটিয়েছে, এখন হাঁটা দিল আজ কেদারনাথে থাকবে। জানালেন স্নোফল হওয়াতে আর রিস্ক নেননি। এখানে ভালো থাকার ব্যবস্থা আছে। তাঁদের বিদায় জানিয়ে আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। অনেক দেরি করে ফেলেছি, যথারীতি শরীর মন আর দিচ্ছে না। যেতে যেতে কতরকম ভাষাভাষী, বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস এমনকি বিভিন্ন ধর্মের মানুষেরও দেখা পেলাম। বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান! বেড়াতে এলে বোঝা যায়, সারা ভারতবর্ষ যেন এক সুতোতে গাঁথা একটি মালা। ভাষা আলাদা আলাদা হলেও সবার একটা কথাই বোঝা যাচ্ছে, “হর হর মহাদেব” সবাই একই সুরে বলে চলেছে, ওঁম নমঃ শিবায়ঃ! এই দু’দিনের কেদার দর্শনে সারা জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যাচ্ছি। মানুষের ভক্তি, নিষ্ঠা বা মনের জোর দেখলে অবাক হতে হয়। কেউ দেখলাম পুরো পথ খালি পায়ে বাবার দর্শন করতে যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা এক সাধুবাবা এভাবেই খালি পায়ে ভারতজুড়ে থাকা বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে বেরিয়েছেন। যে ঘোড়াওয়ালা, পিটঠু, আর দুলি চার জন মানুষ মিলে তীর্থ যাত্রীদের নিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাতে হয়। এই ভাবে তীর্থ যাত্রীদের তীর্থ করাচ্ছে। এই পথে আর একজন মানুষদের ধন্যবাদ না জানালেই নয়, প্রতিনিয়ত রাস্তা পরিষ্কার করে চলেছে, ঘোড়ার মলের জন্য রাস্তা দেখে দেখে হাঁটতে হয়। ঈশ্বরের অসীম করুণা যেন সর্বদা এঁদের সহায় হয়! দেখলাম একজন ভদ্রলোক, যাঁর একটি পা নেই, লাঠির সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ঈশ্বরদর্শনের আকাঙ্ক্ষায়! তাকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেলেও নিজেদের মনের জোর অনেকটাই ফিরে পেলাম। 

ফেরার পথে আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছি না, শুধু একটাই চিন্তা, দেরী হয়ে গেলে গৌরীকুণ্ডে আটকে পড়তে হবে। সন্ধের পর কোনো গাড়ি যায় না।

দ্রুত পা চালিয়ে সন্ধ্যে সাতটায় গৌরীকুন্ড পৌঁছলাম। এখান থেকে সুমো ধরে সোনপ্রয়াগ দিকে রওনা হলাম। প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে, পাহাড়ে অন্ধকার কি ভয়ানক লাগে সেটা ভালোমতো টের পেলাম। আমাদের চেনা গাড়ি সোনপ্রয়াগে অপেক্ষা করছিল। প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ হোটেল জগৎ রাজ পৌঁছে গেলাম। সবার সাথে দেখা হল। ভোলানাথের কৃপায় সবাই সুস্থ আছে দেখে আমিও খুব নিশ্চিন্ত হলাম। মনে মনে দেবাদিদেব মহাদেবকে অন্তর থেকে প্রণাম জানালাম। তুমি সবাইকে দর্শন দিয়েছো, আমার মনবাসনা পূর্ণ হয়েছে।

হে দেবাদিদেব মহাদেব মানুষ যেন চিরকাল এভাবেই তোমার স্নেহচ্ছায়ায় থাকতে পারে! জগতের মঙ্গল কোরো।

আরও পড়ুন >> কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ১/৩

আরও পড়ুন >> রাবনের দেশে >>

Facebook Comments

You Might Also Like