পাহাড় ভ্রমণ

কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ২/৩ – মিলি ঘোষ

সিরিজঃ ভ্রমণ ব্রহ্মাণ্ড 2.0
সম্পাদনাঃ অমরজিৎ মণ্ডল

তেরোই অক্টোবর ২০১৯, সারা দেশ জুড়ে মা লক্ষ্মীর আরাধনা। কোজাগরী পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র কেদারনাথ থেকে দেখব এই সুপ্ত বাসনা মনের মধ্যে ছিল। সেইভাবেই সব পরিকল্পনা। এক বছর ধরে দীর্ঘ অপেক্ষা করে থাকা, সাথে সব ভ্রমণ কাহিনীতে কেদার দর্শন পড়ে ফেলেছি। ইউটিউবে যত ভিডিও ছিল মোটামুটি দেখা হয়েগেছে, প্রতিটা রাস্তা মুখস্ত হয়েগেছে। অনেক বেশি উৎসাহ মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছি। আজ আমার মনোবাঞ্ছা পূরণের সময় হয়ে এসেছে। শুধু মনে মনে ওঁ নমঃ শিবায় জপ করে চলেছি। হে ভোলেনাথ, তুমি সবাই কে দর্শন দিও। শুনেছি ঈশ্বর স্বয়ং না চাইলে কেউ তার কাছে যেতে পারে না।

আমরা আট জন হেঁটে উঠবো আর চার জন, আমার বাবা, মা, কাকুকে নিয়ে মানস হেলিকপ্টারে যাবে। হেলিকপ্টারের বুকিং অনলাইন করা ছিল। ওদের সময় মত ফাটা-তে পৌঁছতে গেলে সকাল ন’টায় বেরোলেও চলবে।

যারা হেঁটে যাবো, একটা গাড়ি তাদের ভোর সাড়ে চারটেয় সীতাপুর থেকে সোনপ্রয়াগ পৌঁছে দিল। এখানে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করে, সাড়ে পাঁচটায় আমরা শেয়ার সুমোতে গৌরীকুন্ড পৌঁছলাম। সুমো স্ট্যান্ড থেকে গৌরীকুন্ড কিছুটা হেঁটে আসতে হয়। এখান থেকে আমরা হাঁটা শুরু করব, আরো অনেকের সঙ্গে জয় কেদারনাথ এর ধ্বনিতে গলা মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ২০১৩-র আগে গৌরীকুন্ড পযন্ত গাড়ি আসতো, এখন সোনপ্রয়াগ থেকে শেয়ার সুমোতেই একমাত্র আসা যাওয়া হয়। গৌরীকুণ্ডে হাঁটা শুরু করার সময় এক পিটঠু এসে আমাদের সাথে যাওয়ার কথা বলে।কিন্তু আমার বোনের ছেলে গুড্ডু মোটেই যেতে চাইছেনা, সে পুরো হেঁটে যেতে চায়। পিটঠু ভাইয়ের কথা শুনে আমরা তাকে আমাদের সাথেই নিয়ে এগোলাম। সে ২০০০ টাকাতে রাজি হল. রাস্তায় কোনো অসুবিধা হলে সে গুড্ডুকে পিঠে নিয়ে যাবে। আমরা সবাই একটা করে লাঠি কিনে নিয়েছি। এখানে বলে রাখি লাঠির ভূমিকা যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশি, শুধু শরীরের সাপোর্ট নয় ঘোড়া তাড়াতেও কাজে লাগবে, ঘোড়া কখনও সামনে চলে আসছে আবার কখনো বা পেছন থেকেও, যেন তাড়া করছে। এইদিকে নজর রেখে হাঁটাটা বেশ মুশকিল। একটা আতঙ্ক কাজ করছিল, কখন এসে না ধাক্কা দিয়ে দেয়! আমাদের সামনে কত গুলো ঘোড়াকে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখলাম। ওদের পিঠে অনেকটা মালের বোঝা!

আমাদের সাথে সাথে মন্দাকিনী তীব্র গতিতে বয়ে চলেছে তার রূপে মুগ্ধ হয়ে এগিয়ে চললাম। আজ আমার স্বপ্নপূরণের দিন, তাই খুব ব্যাকুল ছিলাম, কখন দর্শন পাব। সেই সঙ্গে মনের উত্তেজনাও প্রবল ছিল। এগিয়ে চলেছি, পথে প্রথমে জঙ্গলচটি আসে, বোঝা যাচ্ছে কতটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি, তার সাথে অপরূপ ঝর্ণার সৌন্দর্য পথের ক্লান্তি কিছুটা হলেও কম করে দেয়। হাঁটতে হাঁটতে চেষ্টা করছি কি ভাবে শর্টকাট দিয়ে এগানো যায় কিন্ত এটা আরও কঠিন। এক একবার মনে হচ্ছিল, এই হাঁটাটা যেন আলেয়ার পেছনে চলার মত, যত হাঁটছি কিন্তু কিছুতেই রাস্তার মাপ কমছে না!

কিছুক্ষন পর ভীমবলি এল। পথে প্রচুর ঝরনা পেলাম, তার সাথে কত রকমের পাখি চোখে পড়লো, এখানে কাক গুলো বেশ বড়, যেন এক একটা চিলের সমান! অনেক নাম না জানা ফুল, নানারঙের অচেনা সব পাখি দেখলাম সেখানে।

অল্প অল্প বিশ্রাম নিয়ে হাঁটছি, আমার ছেলে বোন ভাই সবাই অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমরা, মানে, আমি আর অজানা পথে আমার খেয়াল রাখার জন্যই জয় পিছিয়ে পড়েছি। আমরা বুঝতে পারছিলাম জোর করে হাঁটা সম্ভব নয় তার সাথে উচ্চতার জন্য হাঁপিয়ে যাচ্ছি।

হোয়াটস্যাপের মাধ্যমে কথা বলে জানতে পারছি, ওরা কতদূর এগোলো। দেখলাম রাস্তার ধারে অনেক দোকান রয়েছে ম্যাগি, আলুপরোটা, চা, কফি, কোল্ড-ড্রিঙ্কস সব পাওয়া যাচ্ছে। পথে অনেকের সাথে আলাপ হওয়াটা এক বড় পাওনা। আমাদের সাথে সাথে একজন মা আর মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আমরা যখন রেস্ট নিচ্ছি তখন কথা হচ্ছে… কিছু ড্রাইফ্রুট আমরা পরষ্পরের মধ্যে শেয়ার করলাম, এ পথে খেজুর, আমসত্ত্ব, কিসমিস খুব উপকারী। কর্পূরও ভীষণ কাজে দিয়েছে. মাঝে মাঝে নাকে দিয়ে নিলে শ্বাসকষ্ট কম হচ্ছে।

দেখলাম তীর্থ যাত্রীদের জন্য সব রকম ব্যবস্থা আছে, কিছুটা দূরে দূরে বসার চেয়ার, টয়লেট রয়েছে। মেডিক্যাল ক্যাম্পও আছে। গাড়োয়াল পুলিশ ওই পথে হেঁটে হেঁটে পর্যবেক্ষণ করছে, আমদের সাথে আলাপ হল, উনি আমাদের কিছু অসুবিধা আছে কি না জানতে চাইলেন। আর বললেন এত আস্তে আস্তে গেলে আজ পৌঁছাতে পারবেন না। ব্যাস! আর আমার মনের জোর যেন হারিয়ে ফেলছি… মনে মনে শুধু ভোলেনাথের কাছে একটাই প্রশ্ন করছি, আমার এতদিনের ইচ্ছা, শেষপর্যন্ত তোমার কাছে পৌঁছতে পারবো তো?

বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ রামবড়া এলাম। দেখি এখান থেকে আরো সাড়ে দশ কিলোমিটার বাকি, তখনো বুঝতে পারছি না, সত্যিই আর কতটা পথ চলতে হবে, রামবড়া ব্রিজ ক্রস করার সময় দেখলাম এখানে দুটো রাস্তা গেছে, দুটো ব্রিজ একটা শুধু ঘোড়া যাবার আর একটা পায়ে হাঁটা পথ। মন্দাকিনী এখানে ভয়ঙ্কর সুন্দর! কী তীব্র তার গতি, কত প্রবল শব্দ তার কলরোলের! নদীর ধারে বড় বড় করে লেখা আছে এখানে নামা যাবে না। এখানকার কিছু দৃশ্য আমাকে ২০১৩-র ধ্বংসলীলার কথা মনে পড়িয়ে দিল। কত বড় লোহার ব্রিজ পরে রয়েছে, আর অনেকটা জায়গা জুড়ে যে ধ্বস নেমেছিল, বোঝা যাচ্ছে। পুরনো রাস্তার পুরোটাই মনে হল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগছে, মানুষ কতটা অসহায় অবস্থায় ছিল। পালাবার কোন পথ নেই। বিশাল বিশাল পাহাড়, উঠে যাওয়া যাবে না। আবার প্রবল জলোচ্ছাস এসে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে! এখানে এসে, সেই প্রলয়ের সামান্য চিহ্ন দেখেই গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে গেল!

আমরা একটু বসে নিলাম। এখানে থেকে নতুন রাস্তা তৈরি হয়েছে এরপর শুধুই চড়াই রাস্তা, দেখেই মনের জোর হারিয়ে ফেলছি, সত্যি পারবো তো? কিন্তু ভোলেনাথ ঠিক শক্তি দিয়েছিলেন তাই উঠেই চলেছি. আমার ছেলে, ভাই, বোন দিদি সবাই কত এগিয়ে গেছে, জানতে পারছি, কিন্তু কিছু করার নেই। শুধু হাঁটতে হবে, হেঁটেই যেতে হবে। এবার আমরা ছোটি লিনচলীতে কিছু ক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, আরো চড়াই পথ পেরোতে থাকলাম তার মধ্যে একটু অন্যমনস্ক হলেই বিপদ, সবসময় দেখতে হচ্ছে ঘোড়া এসে না ধাক্কা দিয়ে দেয়। এই আতঙ্ক নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।

এর মধ্যে খবর পেয়েছি আমার ছেলে রাজা, বেলা আড়াইটে নাগাদ পৌঁছে গেছে কেদারনাথ মন্দির চত্বরে। আমরা তখনো ছয় কিলোমিটার দূরে, সঙ্গে কৃষ্ণাদি আর জয়। ততক্ষণে শরীরের সব শক্তি যেন শেষ হয়ে আসছে, মনের মধ্যে প্রচুর জোর থাকলেও শরীর দিচ্ছে না। এক এক সময় শুধু চোখ দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। জয় বাবা কেদারনাথ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে চলেছি।

সূর্য অস্ত সময় হয়ে এল, চারিদিকে হঠাৎ মেঘাছন্ন হয়ে গেল, আশেপাশে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুনেছিলাম কেদারনাথ এর এটাই বৈশিষ্ট্য… আবহাওয়া কখন পরিবর্তন হবে কেউই বলতে পারে না, সত্যিই তাই দেখলাম রোদ ঝলমল থেকে হটাৎ মেঘে ঢেকে গেলো, তার সাথে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, আরো কিছুটা এগিয়ে যেতে টের পেলাম স্নো ফল শুরু হয়েছে! হাঁটা আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে যাচ্ছে, আমাদের কাছে রেইনকোট, ছাতা কিছুই ছিল না, কিন্তু সব বাধা পার করে যেভাবেই হোক আজ পৌঁছাতেই হবে!

এখন বিকেল ৬ টা বাজে আমরা প্রায় হেলিপ্যাড পর্যন্ত এসে গেছি, প্রচুর জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এক মূহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিল সেই ২০১৩ বিপর্যয়ের কথা। কীভাবে তারা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে ছিল! আজ এত ঠান্ডা তারওপর ভীষণ জোরে বৃষ্টি, যেন গায়ে সূঁচ বেঁধাচ্ছে। আর কিছুটা এগিয়ে হেলিপ্যাড এর ওয়েটিং হলে আলো জ্বলছে দেখে সেখানে গেলাম, সেখানে গিয়ে দেখি অনেক মানুষজন বসে অপেক্ষা করছে বৃষ্টি থামার। আমরা সবাই মিলে অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রায় এক ঘণ্টা পরে বৃষ্টি হালকা হল, আর অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করলাম, এখান থেকে মন্দির দেড় কিলোমিটার। মনের মধ্যে একটা জয়ের আনন্দ হতে শুরু করেছে। এখান থেকে মন্দিরের আরতির ঘন্টা শুনতে পাচ্ছি, মনে হচ্ছে দৌড়ে গিয়ে মহাদেবের দর্শন করে আসি। প্রায় পৌঁছে গেছি ভেবে এইসময় একটু বসলাম। একটু পরে উঠতে গিয়ে দেখি, সর্বনাশ! শরীরের সব শক্তি যেন শেষ হয়ে গেছে! আর এক পাও ওঠাতে পারছি না! প্রচন্ড কন কনে ঠান্ডা হাওয়া, সব কিছু ভিজে যাওয়াতে ঠান্ডায় কাঁপছি। কোনোরকমে একটু একটু এগিয়ে প্রথম সিঁড়িতে পা দিতেই দেখা গেল মন্দির। মন্দিরের গায়ে আলো দিয়ে সাজানো, যেন মনে হচ্ছে স্বর্গে পৌঁছে গেছি। প্রথম দর্শনে হাত জোর করে প্রনাম জানলাম মহাদেবকে। কিছু বলতে পারছিনা, শুধুই চোখ কান্নায় ভেসে যাচ্ছে। হে মহাদেব আশীর্বাদ করো সবার মঙ্গল হোক।

আমি পেরেছি! আমি পেরেছি তোমার কাছে আসতে, হে ভোলেনাথ… আমার সমস্ত কষ্ট, পথশ্রম, উদ্বেগ, আশঙ্কা যেন ধুয়ে মুছে গেল তোমার পবিত্র দেবালয়ে এসে। (ক্ৰমশঃ)

আরও পড়ুন >> কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ১/৩

আরও পড়ুন >> কেদারনাথের পথেঃ পর্ব ৩/৩ >>

Facebook Comments

You Might Also Like