নানাবিধ বিজ্ঞান ও টেকনোলজি

দাগী রাজহাঁসঃ Bar-Headed Goose – অরুনাংশু চট্টোপাধ্যায়

ডিসেম্বর মাস কাটলেই নতুন বছর। মানে নতুন করে আবার সমস্ত কিছু সজীবতায় ভরে উঠবার সময়। আর জানুয়ারি মাসটা শুধু পিকনিকেই কেটে যায় প্রতি বছর। শুধু বাঙালি নয়, সব ভারতীয় একটু ছুটির ফাঁক খোঁজে, এবং বের হয়ে পড়ে নতুন কোন অজানার সন্ধানে।

বছর শুরুতেই বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আবাহন হয় পঞ্চমী তিথিতে। অবাঙালিরা মেতে ওঠেন বসন্ত পঞ্চমীতে। স্বাদটা সেই একই। নামটাই যা আলাদা। খুব ভোরবেলায় উঠে অঞ্জলির ফুল জোগাড় করা। এসব বাঙালির ঘরে-ঘরের স্মৃতি। অঞ্জলির পর স্কুলে কলেজে খিচুড়ি বা লুচি-আলুর দমের লাঞ্চ। এসব এখনও বর্তমান। অবশ্য নিন্দুকেরা বলে বাঙালির এটাই নাকি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। তারা যা খুশি বলুক বিতর্কে জড়াতে চাই না।

যাক্‌ গে আসল কথায় আসি। বেকার ভূমিকা চলছে।

সরস্বতীর বাহন রাজহাঁসকে সকলেরই মনে আছে নিশ্চয়ই। তবে যেমন ধবধবে সাদা রাজহাঁস শিল্পীরা তৈরি করেন তেমন দেখতে আদৌ নয় কিন্তু। রাজহাঁস মানে ধবধবে সাদা, লম্বা গলার হাঁসটার কথা মনে পড়ে। তবে কেমন দেখতে রাজহাঁসটাকে ? যে সরস্বতীর বাহন ?

আমার আলোচনার বিষয়বস্তুই হচ্ছে এই রাজহাঁসটাকে নিয়ে। যেটা শাস্ত্রে সরস্বতীর বাহন হিসেবে পরিচিত। সুন্দর এই হাঁসটার নাম ‘দাগী রাজহাঁস’ বা ‘Bar-Headed Goose’.

আমাদের দেশের ঋষি-মহাঋষিরা বরাবরই ভীষণ জ্ঞানী। তাঁরা যেমন পণ্ডিত তেমন বৈজ্ঞানিকও ছিলেন বললে বেশি বলা হবে না। তাঁদের বিভিন্ন দূরদর্শিতার নজিরের অন্যতম উদাহরণ এই হাঁসটা। এর আশ্চর্য ক্ষমতা। কয়েক শতাব্দী আগেই তাঁরা জানতেন। সেই মহামানব তাই বোধ করি সাধনালব্ধ হাঁসটাকে সরস্বতীর বাহন হিসেবে জনসম্মুখে এনেছেন। 

বেদব্যাস এই হাঁসের উল্লেখ করেন মহাভারতে। তিনি স্বয়ং এই হাঁসের দর্শন পান মানস সরোবরে মিথুনরত অবস্থায়। তিনি কৈলাসে তখন তপস্যারত। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন ও মনে করেন ঈশ্বরের বিশেষ আশীর্বাদ না থাকলে এমন ক্ষমতা এই হাঁসের হবে না। বহু প্রাচীন কাল অবধি এই হাঁসকে ঈশ্বরের বরদান হিসেবে মেনে চলা হত। 

চার দশকের শ্রেষ্ঠ কবি কালিদাস, তিনিও এই হাঁসের উল্লেখ করেছেন। লেখার তাগিদে কবি কালিদাস বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতেন। প্রায়শই হিমালয়ে পাড়ি জমাতেন। এখানেই তিনি এই হাঁসের দেখা পান। তাঁর বিখ্যাত ‘রঘুবংশ’ কাহিনীতে এই রাজহংসের উল্লেখ করেছেন।

 daagi-rajhaansh-bar-headed-goose-arunanshu-chattopadhyay

‘Bar-Headed Goose’-এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘Anser indicus‘ (এন্সার ইন্ডিকাস – লাতিন)। এই হাঁস ‘এনাটিডি’ পরিবারভুক্ত। লাতিন ভাষায় ‘এন্সার’ কথার অর্থ বড় আকারের পরিযায়ী। ‘ইন্ডিকাস’ মানে ভারতীয়। অর্থাৎ পুরো বাংলায় হল – বড় আকারের পরিযায়ী রাজহাঁস।

শুধু ভারতে নয় বাংলাদেশ, দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য এশিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। শীতকালে এরা মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় পরিযায়ী হয়ে আসে। শীতের শেষে আবার স্ব-স্থানে ফেরত চলে যায়।

প্রায় ২০ লক্ষ্য ২০ হাজার বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে এদের বিচরণ ক্ষেত্র। IUCN (International Union for Conservation of Nature) এই প্রজাতিকে সম্প্রতি নূন্যতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এই প্রজাতি সংরক্ষিত। এই হাঁস এক প্রজাতিক, মানে এর কোন উপ-প্রজাতি নেই।

আমাদের দেশের বিভিন্ন পাখিরালয়ে তো বটেই, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু পাখিরালয়ে এদের দেখা মেলে। অবশ্যই শীতকালের পরিযায়ী হিসেবে। যেমন কুলিক পাখিরালয়, রসিকবিল অন্যতম। আগেই বলেছি মানস সরবোরে, লাদাখের প্যাংগং লেক, রাজস্থানের তাল চাপার গ্রামের ঝিলে, গ্যাংটকের গুরুদংমার লেক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য, এখানে এই হাঁসের বিচরণ ক্ষেত্র।

এরা অনেক উঁচু দিয়ে ফ্লাইট করতে পারে। অনেক উঁচু দিয়ে উড়তে পারার প্রজাতির মধ্যে এই হাঁস অদ্বিতীয় এবং অন্যতম। বৈজ্ঞানিক মহলে এক বিস্ময় ! জিরো অক্সিজেন লেভেলেও স্বাচ্ছন্দ্য ফ্লাইট করে দাগী রাজহাঁস। সেটা যে কি ভাবে সম্ভব সেই কারণই তমসাবৃত বৈজ্ঞানিক মহলে। তবে কিছুটা আন্দাজ করা হয়েছে। কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

বৈজ্ঞানিকগণ মনে করেন হাঁসের পালকের ভেতর এমন কোন গ্রন্থি আছে যাতে অক্সিজেন রিজার্ভ করে রাখা যায়। সেই গ্রন্থির জন্যই স্বাচ্ছন্দ্যে জিরো অক্সিজেনেও ফ্লাইট করতে পারে।

পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালু। যার উচ্চতা ৮৪৮১ মিটার। বলা বাহুল্য, এই হাঁস স্বাচ্ছন্দ্যে এই উচ্চতা দিয়ে উড়ে চলে। এবং তা পার হয়ে দক্ষিণে চলে আসে। আবার এটাও শোনা গেছে মাউন্ট এভারেস্টের (যার উচ্চতা ৮৮৪৮ মিটার) উপর দিয়েও ফ্লাইট করে। যদিও এর সত্যতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এই হাঁস বৈজ্ঞানিকদের কাছে এক বিস্ময়কর প্রকৃতি ও শরীর। তাঁরা এই রহস্য ভেদের ক্রমশ চেষ্টা করে চলেছেন।

এবার আসা যাক রাজহাঁসটা চেনবার কিছু বৈশিষ্ট্যে। ‘Bar-Headed Goose’ একটা বৃহৎ জলচর পরিযায়ী। এদের দৈর্ঘ্য কমবেশি ৭৫ সেমি। ডানা ৪৫ সেমি। ঠোঁট ৫.৬ সেমি। লেজের আকার প্রায় ১৪.৮ সেমি থেকে ১৫ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পা ৭.১ সেমি। মোট ওজন হতে পারে ১.৬ কেজি থেকে ৩.৩ কেজি।

পূর্ণবয়স্কদের দেখতে হয় ধূসর রঙের। সাদা মাথা থেকে একটা লাইন গলার নিচে চলে গেছে। মাথায় স্পষ্ট দুটো কালো ডোরা থাকে। এতটাই স্পষ্ট ফ্লাইটের সময়ও সেই ডোরা বোঝা যায়। চোখ বাদামি। ঠোঁট হলুদ রঙের। ঠোঁটের অগ্রভাগ ও নাক কালো। পা ও পায়ের পাতা গাঢ় হলুদ। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারা একইরকম। শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাথায় ডোরা থাকে না। কপাল, গলা, গাল মলিনতায় মসৃণ। মাথায় চাঁদি ধূসর ও বাদামি, পিঠ ও পেট একই রকম হয়। স্ত্রী হাঁস এক সাথে তিন থেকে আটটা ডিম পাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার বাহক এই রাজহাঁস। এরা ভীষণ শান্ত ও শান্তিপ্রিয় হয়। স্বভাব ভীষণ মিষ্টি। হিংস্র মোটেই নয়। গরম সহ্য করতে পারে না। গ্রীষ্মকালে হিমালয় পর্বতমালার সুউচ্চ শিখরের জলাশয়ে এদের দেখা মেলে। জলাশয়ের পাশের ঝোপঝাড়ে এরা ডিম পাড়তে ভালোবাসে। জলজ উদ্ভিদ, শেওলা, নানাবিধ পাতা এদের প্রধান খাদ্য। এদের প্রধান শত্রুও রয়েছে। কাক, দাঁড়কাক, শিয়াল, গাংচিল, সিন্ধুঈগল – এদের মূলত শিকার এই হাঁস।

যাই হোক প্রকৃতি বা প্রকৃতির সৃষ্ট সম্পদ মরণাপন্ন। সেই সম্পদ শিকার করে বা অত্যাচার করে নষ্ট না করাই শ্রেয়। তাই শুধু ‘Bar-Headed Goose’ নয়, সব প্রাণীরই বাঁচবার অধিকার এই পৃথিবীতে রয়েছে। তাই খোলা আকাশেই তাদের ভালো মানানসই স্থান। সেখানেই তারা চিরকাল থাকুক।

 আরও পড়ুন >>
Facebook Comments

You Might Also Like