ছোটগল্প সাহিত্য

উপনেত্র – সুজান মিঠি

সিরিজঃ চশমা
সম্পাদনাঃ শোভন সেনগুপ্ত

বরেন্দ্র বাবুর গৃহস্থে যেমন আছে বনেদিয়ানা, তেমনই তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দীর্ঘকালীন ব্যবসাও রীতিমত বনেদী এবং অভিজাত। তাঁর বাড়ির প্রত্যেক প্রজন্মই করে এসেছে এই ব্যবসা, উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে আভিজাত্য, শ্রী এবং প্রসার।

সেই কবে তাঁর পিতামহ শুরু করেছিলেন চক্ষু সমস্যার সমাধানের উপায়, চশমা প্রস্তুত ও বিক্রি, সেই অবধি চলেই আসছে এই ব্যবসা। বরেন্দ্রবাবুর পিতামহ থেকে শুরু করে প্রপৌত্র পর্যন্ত চলছে এর বিস্তার।

তবে তাদের ব্যবসার বিশেষ যে দিকগুলি আভিজাত্যের নির্দেশ করে, তার মধ্যে একটি হলো শুরুর থেকে চশমার ভাঙা খারাপ নষ্ট হয়ে যাওয়া চশমার ফ্রেম কাঁচ সমস্তই এরা রাখেন যত্ন করে। একটা ঘরের মধ্যে থাকে অতীত ঐতিহ্য। বরেন্দ্রবাবু নিজেও রেখেছেন এভাবেই।

যে ঘরটিতে সঞ্চিত থাকে অচল চশমা, সেই ঘরে বাড়ির অন্য সদস্যদের প্রবেশের অনুমতি মেলেনা। বরেন্দ্রবাবুর নাতি বিজয়বাবু এখন এই ব্যবসার প্রদর্শক। তাঁর একমাত্র পুত্র অনিশ মেধাবী বুদ্ধিমান ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার ব্যবসাক্ষেত্রেও এসে বসে বিকালের সামান্য অবসরে।

 বিজয়বাবুর বাবা অমলবাবু বলেন, 

–দাদুভাই, শিখে নাও, শিখে নাও, এমন ভাবে শিখবে, যেন আমাদের এ পরিবারের চশমা-লক্ষ্মী থেকে যান শেষ বংশে এসেও। 

বহু দূর দুরান্তে পৌঁছে যায় তাদের চশমার নানারকম মডেল, ফ্রেম, কাঁচ, ফাইবার, পাওয়ার।

অনিশ ঘুরে ঘুরে দেখে কিভাবে তৈরি হয় এসব। কোন ঘরে কী আছে রাখা। একদিন এভাবেই কৌতুহলী অনিশ বাবার চোখের আড়ালে ঢুকে পড়ে সেই ঘরে, যেখানে রাখা থাকে তাদের বিবর্তনের পূর্বরূপেরা, পুরানো চশমার সঞ্চয়। ঘাঁটতে ঘাঁটতে কোনো কোনটা আবার তুলে নিয়ে চোখে দেয় অনিশ। সাহেবদের ছবিতে যেমন দেখেছে, তেমন একটাকে তুলে নিয়ে চোখে দিয়ে জুতোয় আওয়াজ তুলে খটখট করে চলে, দাদুর সঙ্গে নাটক দেখতে গিয়ে যেমন দেখেছিল সাহেব সাজের লোকটিকে, তেমন ভাবে অভিনয় করে হাঁটতে হাঁটতে। আবার কখনো নাকের উপর ফ্রেমটাকে টেনে এনে আর কানে একটি পেন গুঁজে পন্ডিত মশাই হয়ে সামনে রাখা কাগজটার লেখা পড়ে নিজেই। 

এরকম নানা চশমা নিয়ে সে কখনো সাহেব কখনো পন্ডিত কখনো আবার তার বাবা হয়ে যায় মনে মনে। গম্ভীর স্বরে বলে নিজেকেই, খোকন পড়তে বসো। এসব ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ তার চোখ যায় ডাঁটি ছাড়া শুধু দুটি কাঁচ সম্বলিত এক অদ্ভুত ডিম্বাকৃতি চশমা, তাকে চশমা না বলে শুধু ডিম-কাঁচ ও বলা চলে, লুকিয়ে লুকিয়ে নিয়ে আসে নিজের পড়ার ঘরে। 

সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসে বের করে তার সেই সঙ্গে আনা ডিম-কাঁচ। দুলে দুলে পড়ার সময় নাকের ডগায় লাগিয়ে নেয় তাকে। বিজ্ঞের মত হাবভাবে হোমওয়ার্কের খাতা মেলে ধরে সামনে। প্রশ্ন গুলোয় চোখ বোলায় ওই কাঁচের মধ্য দিয়ে। হঠাৎ আশ্চর্যজনকভাবে সে লক্ষ্য করে প্রত্যেকটি প্রশ্নের পাশে পাশে লিখে রাখা উত্তরগুলি জ্বলজ্বল করছে তার খাতায়। অনিশ উত্তেজনায় চশমা খুলে ফেললো চোখ থেকে, কোনো উত্তর খুঁজে পেলনা। আবার পরার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠলো উত্তর। সে তাড়াতাড়ি বের করলো অঙ্ক, যে গুলো পারেনি করতে অনেক চেষ্টাতেও এবং সে জানতো এর জন্য পরদিন স্কুলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু সেই অঙ্ক খাতার উপর তার ডিম-কাঁচের দৃষ্টি পড়তেই দেখতে পেল কত সহজ পদ্ধতিতে ভেঙে ভেঙে অঙ্কগুলো কষে দেওয়া আছে খাতায়।

মেধাবী অনিশের এই চশমার বিশেষ প্রয়োজন না থাকলেও এমন অদ্ভুত অত্যাশ্চর্য সে লুকিয়েই রাখলো নিজের কাছে। বাড়িতেও  বললো না কাউকে। পরীক্ষার সময় জামার পকেটে করে নিয়ে গেল নিতান্ত যদি প্রয়োজন লাগে এই ভেবে। 

অনিশ দেখলো কিছু প্রশ্নের উত্তর তার জানাই ছিল কিন্তু কয়েকদিনের এই নতুন আবিষ্কারে তার পড়াশোনার খামতি ঘটায় সে ভুলে গেছে। পকেট থেকে চুপিচুপি বের করে তার চশমা। নাকের ডগায় ধরে দেখে নেয় সামান্য, তারপর আবার গড়গড় করে লিখতে শুরু করে সে।

পরীক্ষক ছিলেন ভীষণ কড়া ধাতের মানুষ। তিনি লক্ষ্য করলেন বিষয়টি। অনিশের কাছে এলেন চুপিসারে, 

‘এই স্ট্যান্ড আপ। টুকলি হচ্ছে অনিশ! তুমি না ফার্স্ট বয়। তুমিও টুকলি! ছি ছি। দাও ওই কাঁচ। দেখি ওতে কী লেখা আছে। কি হলো, দাও বলছি।’

কাঁপতে কাঁপতে অনিশ তার সাধের চশমার কাঁচজোড়া তুলে দেয় মাস্টারমশাই এর হাতে। এদিক ওদিক নাড়িয়ে খুলে পরে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষার পর অনিশের হাতে ফেরত দিয়ে বললেন, 

‘পরীক্ষা দিতে এসেছ না খেলা করতে? এসব নিয়ে বাড়ি গিয়ে খেলবে। এখন লেখো।’

অনিশ যত্নে পকেটের আড়ালে রেখে দেয় কাঁচ। বুঝতে পারে, এই কাঁচে মাস্টারমশাই কিছুই দেখতে পাননি।

কিছু বন্ধুদের চোখে পরিয়েও অনিশ বুঝে নেয় এই কাঁচ শুধুমাত্র তাকেই সাহায্য করবে, আর কাউকে নয়। কেবল তার জন্যই এই কাঁচ। 

 সেই ডিম কাঁচের অল্পবিস্তর সাহায্য নিয়ে অনিশ বড় হয়ে উঠলো।

ইদানিং অনিশ কাঁচজোড়াকে কখনো কাছ ছাড়া করেনা। প্রশ্নের উত্তর দেখানো দিয়ে শুরু করে এখন তার সেই চশমা তাকে অনেক কিছু দেখায়, সে যা চায় দেখতে পায় তাই। ঘরের মধ্যে বসে সে পেতে চায় পাহাড়, ঝর্ণা, সমুদ্রের সান্নিধ্য, অমনি অনুভব করে সে এসে হাজির হয়েছে পাহাড়ে, সমুদ্রে, ঝর্ণায়। সে ইচ্ছে করলে বানিয়ে নিতে পারে কবিতা-গল্প, কলম বুলিয়ে বুলিয়ে। 

অনিশের পরম বন্ধু হয়ে উঠলো চশমাটা।

বাড়ির সামনের বাগানে বসে গোলাপের গাছটার দিকে তাকালো অনিশ। চোখে চশমাটা নিয়েই। 

ভাবলো আচ্ছা এইযে গোলাপ এত সুন্দর সে আগের জন্মে কি ছিল? সে কি এমনি কোনো সুন্দর গোলাপ গাছ ছিল নাকি অন্যকিছু? ভাববার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফুলসুদ্ধ গোলাপগাছটা ছোট্ট ছোট্ট সবুজ ঘাস হয়ে গেল হঠাৎ। গোলাপ ফুলগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল নিমেষে। অনিশ এক ঝটকায় চশমা খুলে ফেললো চোখ থেকে। সামনে দেখলো, গোলাপগুলো সেই তেমনই আছে, যেমন ছিল। সে বুঝলো, গোলাপ গাছটা পূর্বজন্মে ঘাস হয়ে জন্মেছিল।

এক অদ্ভুত নেশা চাপলো অনিশের মাথায়। সে যে কোনো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে চায় তার অতীত, আবার কখনো দেখতে চায় তাদের ভবিষ্যতও। সঙ্গে সঙ্গে চশমার কাঁচে ফুটে ওঠে তাদের অতীত- ভবিষ্যৎ।

 সে দেখেছে তাদের বাড়ির রান্নামাসি আগের জন্মে ছিল তার বন্ধু দীপকের ঠাকুরমা। মারা গিয়ে এজন্মে তাদের বাড়িতে রান্নামাসির কাজ করে, দীপক চেনেও না তার পূর্বজন্মের ঠাকুমাকে। সে দেখেছে রান্নামাসি এরপর একটা লটারির টিকিটে অনেক টাকা পেয়ে তার অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাবে ব্যাঙ্গালোর। অনিশ দেখেছে তাদের পাড়ার হাঁদু পাগল ছিল আগের জন্মে এক বড়সড় ডাক্তার। কিন্তু খুব পাষান-হৃদয় থাকায় কেউ তার কাছে যেতে চাইতো না চিকিৎসা করাতে। হাঁদু পাগলের ভবিষ্যৎ দেখলো অনিশ, তার পাগলামি যাবে কমে। ফিরে আসবে তার হারানো বিক্রি হয়ে যাওয়া মেয়ে, বাবা মেয়ের সংসারে সুখ ফিরবে ফুটপাতে।

অনিশ যখন ইচ্ছে যাকে ইচ্ছে অতীত ভবিষ্যতে নিয়ে যেতে পারে, 

এভাবেই চাপা স্বভাবের মেধাবী ছেলেটা তার ডিম-কাঁচ নিয়েই কাটাতো সময়। তার সম্পর্কে কারো কোনো অভিযোগ ছিল না। কারো কোনো ক্ষতি কখনো করেনি সে।

একদিন বাড়ির সকলের সঙ্গে বেড়াতে গেল পাহাড়ে। পাহাড়ে উপস্থিত হয়েই দল ছেড়ে একলা হয়ে পাহাড়ের পাদদেশের জঙ্গলে যায় তার বন্ধুটিকে সঙ্গে নিয়ে। গাছেদের পূর্ব আর উত্তর জন্ম দেখতে শুরু করে আনন্দে আবার কখনো দুঃখে। কারো বা তরতাজা জীবন অব্যাহত থাকবে এখনো দীর্ঘকাল, আবার কারো উপর আছড়ে পড়বে প্রবল ঝড় খুব সামান্য দেরীতেই মাত্র।

এভাবে দেখতে সবসময় অনিশের ভালো লাগে না, সে চায় এই চশমাটা রেখে আসবে তার সেই ঘরে। কিন্তু গোপনীয়তার এক অমোঘ আকর্ষণে সে পারেনি তা।

এভাবে গাছ দেখতে দেখতে হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় বনের মধ্যে কাঠ কুড়ানো এক মেয়ের দিকে। অনিশ আশ্চর্য হয়ে দেখলো মেয়েটির পূর্ব জন্মের ছবি। সেই কাঠ কুড়ানো মেয়েটা তারই সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে আছে বুকে জড়িয়ে। অনিশ আবার দেখলো, সেই এক দৃশ্য। অনিশ নিজের পূর্ব জন্ম দেখলো মেয়েটির সঙ্গে। এরপর অতীত থেকে ভবিষ্যতে যেতে চাইলো সে। সঙ্গে  সঙ্গে দেখতে পেল কাঠ কুড়ানো মেয়েটার সঙ্গে অনিশের বিয়ের দৃশ্য। দুজনের মালাবদল। লাজুক চোখের শুভদৃষ্টি।

শান্ত চাপা ছেলেটা চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে দেখে মেয়েটা তার দিকে ভ্রুক্ষেপমাত্র না করে একমনে কাঠ কুড়ানোর কাজেই ব্যস্ত। অনিশ ভয়ে বা লজ্জায় সংকুচিত হয়ে ছুটতে থাকে দ্রুত পায়ে, উঠে যেতে থাকে পাহাড়ের উপরে। কিন্তু পাহাড়ি পথে উৎরাই তার দখলে না থাকায় পায়ে লাগে মোক্ষম হোঁচট। গড়িয়ে পড়ে যেতে থাকে নীচে গভীর খাদের দিকে। জ্ঞান হারানোর আগেই সে বুঝতে পারে কেউ তাকে ধরে নিয়েছে পড়ে যাওয়ার আগেই। 

জ্ঞান ফেরার পরে অনিশ দেখলো তাকে বাঁচিয়ে বাবা মায়ের কাছে নিয়ে এসেছে মেয়েটিই, এখন তাদের তাঁবুর বাইরে গল্পে মত্ত তার মায়ের সঙ্গে। অনিশ এদিক ওদিক হাতড়ালো ভীষণভাবে, কিন্তু কিছুতেই তার বন্ধুটিকে আর খুঁজে পেলনা। সবার অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা বন্ধুটির খোঁজ নিতেও পারলো না কারো কাছ থেকে। বুঝতে পারলো পাহাড় নিয়ে নিয়েছে তার ডিম-কাঁচ। বুঝতে পারলো সে আর কখনো ফিরে পাবেনা তাকে।

মনখারাপ নিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতেই শুনতে পেল পাহাড়ী কাঠ কুড়ানো সেই মেয়েটা তার মাকে ডেকে বলছে, 

–মা’জী, এধার আ’না, বাবুজী ঠিক হো গ্যায়া। বাবুজী ঠিক হো গ্যায়া।

অনিশের মা ছেলের জ্ঞান এসেছে শুনে ছুটে আসতে আসতে তার স্বামীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ওগো শুনছো! তুমি লক্ষ্মীর বাড়িতে কথা বলো, ওর জন্যই আমার খোকনকে ফিরে পেয়েছি। ওর সৎ মায়ের অত্যাচার আর ওকে পেতে দেব না। নিয়ে ওকে যাবোই।’

অনিশের মনে তখন মালাবদলের ভয় ধীরে ধীরে রোমাঞ্চে পরিবর্তিত হচ্ছে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা লাজুক মেয়েটির সঙ্গে অযাচিত শুভদৃষ্টিতে। 

উপনেত্র হারিয়ে গেলো বটে তবে হারানোর আগে এক জোড়া সবুজ-পাহাড়ী-প্রাণ-চঞ্চল-নেত্রের দৃষ্টির বাঁধনে বেঁধে দিয়ে গেল আনিশকে এই সবুজ পাহাড়ে।

আরও পড়ুন >> যেসব সমাধানহীন প্রশ্ন করে গেলেন সুশান্ত সিংহ রাজপুত >>

Facebook Comments

You Might Also Like