ছোটগল্প সাহিত্য

উপলব্ধি – বিভাস গুহ

নীলমণি গাঙ্গুলী। পঁয়ত্রিশ বছর কলকাতা বউবাজার বস্তি অঞ্চলে এক কামরার ভাড়ার ঘরে বাস করছেন। অবশেষে সরকারী চাকরী থেকে অবসর গ্রহণ করে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে বড় অঙ্কের টাকা পেয়েছেন। সেই দিয়ে আগে কেনা দমদম থানার অর্ন্তগত বেদিয়াপাড়া অঞ্চলে দু’কাঠা জমির উপর দু’বছরের ঐকান্তিক প্রয়াসে নিজ বাড়ি তৈরী করলেন। এই বছর দুই প্রায়শই তিনি দিনে আসতেন ও বিকেলে ফিরে যেতেন। ফাল্গুনে আজ তাঁর গৃহপ্রবেশ। পূজাপার্বণ ও অতিথি অ্যাপায়ণের পর সন্ধ্যায় তিনি তাঁর বিধবা মা জগোমোহিনী, স্ত্রী সুমতি, কন্যা সুভাষিণী ও পুত্র সঞ্জয়কে নিয়ে এক কামরার ঘর ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে এ বাড়িতে চলে এলেন। আজই তার প্রথম নিশিযাপন।

এখানকার মনোরম পরিবেশ তার ভীষণ পছন্দের, কতকটা পূর্ববঙ্গের দেশের কথা মনে পড়ায়। বাড়িটির দু’পাশে মাটির রাস্তা ও কাঁচা নর্দমা রয়েছে। বাড়ির কতকটা পিছনে বাগজোলা খালের জল মন্থর গতিতে বয়ে চলেছে। এই খাল পার হওয়ার জন্য কাঠের পাটাতন পাতা বাঁশের বাঁধুনি দিয়ে গড়া অপোক্ত পোল রয়েছে। বৃহৎ খেলার মাঠ ও পুকুর, বাড়ির সামনে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি মুদির দোকান, গাছগুলোর ডালে ডালে বিভিন্ন বর্ণের ফুল, আম, কাঁঠাল ঝুলছে, ঘেরানো ও খালি জমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঠিক গ্রাম নয় তবু যেন সেই মিষ্টি গ্রাম্য আস্বাদ।

সূর্যাস্তের পর মেঘহীন আকাশে পূণিমার চাঁদ উঠল। সেই অপার্থিব জ্যোৎস্নাময়ী রাতের সৌন্দর্য্যের বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, নিঝুম পরিবেশ। জোনাকি যেন অন্ধকার নিবারণে সদা বদ্ধপরিকর। একটু বেশী রাতে শোনা গেল শেয়ালের ডাক। কল্পনার আবেশে নীলমণির পঁয়ত্রিশ বছর আগের ছেড়ে আসা দেশের বাড়ির কথা মনে পড়তে লাগল। তবে শরীর ক্লান্ত থাকায় খুব বেশীক্ষণ জেগে থাকা সম্ভব হল না।

পরদিন কোকিলের ডাকে নীলমণির ঘুম ভাঙলে, তিনি প্রাতঃভ্রমণে বের হলেন। তখন ভোররাত। সূর্যের আসা ও চাঁদের যাওয়া পুরোপুরি ভাবে ঘটেনি। আলো ফুটলে, তিনি দেখলেন পুকুরে ডুবে থাকা গাছের ডালে বসে একদৃষ্টে জলের দিকে তাকিয়ে আছে মাছরাঙ্গা পাখি, পায়রা দল উড়ে বেরাচ্ছে, কাঠবিড়ালি গাছে ওঠানামা করছে, মাঠে একপাল গরু, পাখিদের কোলাহল, কুকুরের ডাক, দূরে রেলগাড়ির ইঞ্জিনের অস্পষ্ট আওয়াজ – কোথায় কলকাতার বউবাজারের গলির ব্যস্ত কোলাহল আর কোথায় শহরতলিতে বেদিয়াপাড়ার এই স্বর্গীয় অনুভূতি। তাঁর দু’চোখ মুদে এল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে তিনি বারান্দায় গিয়ে বসলেন, গাছের ফাঁকে মেঘের ভিতর দিয়ে সূর্যাস্ত একমনে দেখতে লাগলেন।

 কসময় সন্ধ্যা হয়ে চাঁদ উঠল। গুমোট গরম, হাওয়া নেই, গাছের পাতা নড়ছে না। একটু হাওয়ার জন্য সবাই ছাদে এল। এমন সময় বাড়ির কাছে শোনা গেল গ্যাঁঙর গ্যাঁঙ ডাক। বহুকাল পরে শুনলেও ডাকটি নীলমণির খুব চেনা। নীলমণির মা বার্ধক্যে শয্যাশায়ী। তিনি বিড়বিড় করে বলে উঠলেন – “বৃষ্টি আসবে”। ব্যাঙ ডাকলে বৃষ্টি আসে, নীলমণি সেটা জানেন, তিনি মুচকি হাসলেন। বাকিরা কথাটা শুনতে পেয়ে আকাশের দিকে চাইল। কিছুক্ষন পর বজ্র বিদ্যুৎ সহ কালবৈশাখীর ঝড় এসে গেল। সবাই ছাদ থেকে ছুট্টে নেমে এল। ঝড়ের সাথে বৃষ্টিও চলল প্রায় ঘন্টা খানেক। বৃষ্টিতে রাস্তায় এক হাঁটু জল জমে গেল। জমা জল বাড়ির ভেতরে একেবারে শোবার ঘরে এসে ঢুকল। এমতাবস্হায় কয়েকটি ব্যাঙ জলের ধাক্কায় বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। সবাই ভয়ে খাটে গিয়ে উঠল। নীলমণি লাঠি নিয়ে তাড়াতে উদ্যত হল। তাতে ব্যাঙেরা আরো ভয় পেয়ে ক্রমাগত বাড়ির ভিতর চারিদিকে ঘুরতে লাগল। ব্যাঙেদের গতিবিধি দেখে, নীলমণি তাদের না তাড়িয়ে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখতে লাগল। ছোট্টবেলায় এদের চলন নকল করে সে দু’পায়ে কাদার ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে খেলত। এদিকে বিয়ের পর সুমতিও কখনো এইরকম পরিবেশে কাটায়নি। তার কাছে এই পরিবেশ অবসাদময় হয়ে উঠছিল। রাত গভীর হলে সকলে ঘুমিয়ে পড়ল। নীলমণি বিছানায় শুয়ে জেগেই রইলেন। আধোনিদ্রায় তিনি তাঁর স্কুল বয়সে ব্যাঙাচি হাতে করে নিয়ে শিক্ষক মহাশয়ের ধুতিতে নিক্ষেপ করায় যে পরিমাণ মার খেতে হয়েছিল, সেই স্মৃতি মনে পড়ায় হাসি পেয়ে গেল।

সে রাতে জল কমল না। সকালে উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখলেন সূর্যের কিরণ রাস্তায় জমে থাকা জলের ওপর পড়ে সোনালী ছটায় চারিদিক আলোকিত করে তুলেছে। বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ ধরে পাশের ঘর থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনে গিয়ে দেখলেন – সঞ্জয় একটি জামাকাপড়ের ব্যাগ ও পড়ার ব্যাগ নিয়ে যাবার জন্যে প্রস্তুত। সে এই পরিবেশে থাকতে রাজি নয়। সুমতির অনুরোধ – আদেশ কিছুই সে গ্রাহ্য করল না। ভাড়া বাড়ির চাবি নিয়ে জল পেরিয়ে চলে গেল পুরানো জীবনের টানে। সুমতি ও সুভাষিণীরও এই পরিবেশে থাকতে ইচ্ছে করছিল না, তাও কর্তব্যের তাগিদে রয়ে গেলেন। তাদের মনে অসন্তোষ জমে রইল। প্রয়োজন ছাড়া কেউ নীলমণির সঙ্গে রাগে কথা বলল না। ক্রমে, বেলা বাড়লে জল কমে গিয়ে আবার আগের পরিবেশ ফিরে এল। দিন সাতেক চলার পর খাবারের অসুবিধে হওয়ায় সঞ্জয়ও বাড়ি ফিরল।

এর দু’বছর পর এক শ্রাবণের বৃষ্টি মুখর সকালে নীলমণির মা চোখ বুজলেন। নীলমণি নিজেকে বড় একলা অনুভব করতে লাগলেন। তাঁর বাড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হবার চেষ্টার ভিতর দিয়ে তিনি মাতৃবিয়োগের বেদনা ভোলার প্রয়াস করতে লাগলেন।

কিন্তু সময়ের হাত ধরে পরিবর্তনের ছোঁয়ায় এই পরিবেশও একদিন রুক্ষ শহরে রুপান্তরিত হল। মাটির রাস্তাগুলো বড় পিচের রাস্তা হল, কাঁচা নর্দমাগুলো ঢেকে গেল, বাগজোলা খালের ওপর পারাপারের পোক্ত সিমেন্টের ব্রীজ তৈরী হল। খেলার মাঠ ও জমিগুলো প্রমোটারদের হাতে বড় বড় অট্টালিকায় বদলে গেল। রাস্তার মোড় ও গলিতে বৃহৎ বাতির আলো লাগান হল, চাঁদের আলোও ফিকে হয়ে গেল। পশুপাখির কোলাহল শুনতে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে নীলমণির বাড়িও বড় হয়েছে। তাতে বাতানুকূল যন্ত্র, রঙ্গিন ছবির দূরদর্শন, গরম জলের মেশিন, মোবাইল ফোন আরো কত কি রয়েছে।

সুভাষিণীর বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর চাকরির কারণে সে আজ আমেরিকাবাসী। সঞ্জয়ের এখন নিজস্ব ব্যবসা। সুভাষিণীর বিয়ের পরের বছরই সঞ্জয়ের বিয়ে হয় সুলক্ষনার সাথে। নীলমণি আজকাল বাড়ির মধ্যে থাকে। প্রাতঃভ্রমণে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ। আজকাল ছাদেও বড় একটা যাওয়া হয় না। সারাদিন বাড়িতে বসে দূরদর্শনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সঞ্জয়ের দেওয়া নতুন মোবাইল নিয়েই দিন কেটে যায়। কিছুমাস পর নতুন সদস্য নাতি নীলাদ্রীর (নীলু) আগমনে তার আর সুমতির জীবনে ব্যস্ততা ও আনন্দ দুই বেড়ে গেছে। আজকাল তিনি ভাল আছেন, ব্যস্ত আছেন।

এক বিকেলে দোতলার বারান্দায় বসে তিনি মোবাইল দেখছিলেন, তখনি মোবাইলের স্ক্রীনে দেখলেন – আজ সন্ধের মধ্যে নিম্নচাপের বৃষ্টি আসবে ও আগামী ৪৮ ঘন্টা বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা আছে। সন্ধে হওয়ার কিছু পরই বৃষ্টি নামল। রাতভোর বৃষ্টির পর সকালে একটু কমলেও বিকেল থেকে আবার মুষলধারায় নামল। বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমা শুরু হল, এবং একসময় জমা জল বেড়ে রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির একতলায় এসে ঢুকল। সেখানে সামান্য কিছু অপ্রয়োজনীয় আসবাব ছাড়া আর কিছু নেই।

এদিকে রাস্তায় জল জমে থাকতে দেখে নীলু খুব খুশি। বারান্দা থেকে কাগজের নৌকা বানিয়ে সে লাফাতে লাফাতে জলে ভাসাচ্ছে। নীলমণি ছাড়া আর বাকি সকলেই বৃষ্টির পরিবেশ উপভোগ করতে লাগল। নীলমণির যেন কি হয়েছে, তিনি সকলের অলক্ষ্যে নিজের ঘরে একা বসে রইলেন। বিষয়টা সকলেরই চোখে পড়ল, কিন্তু শরীর ভালো নেই মনে করে কেউই কিছু বলল না। নীলমণি রাতে কিছু খাবেন না বলে সময়ের আগে গিয়ে শুয়ে পড়লেন, কিন্তু তাঁর চোখে ঘুম নেই। মাঝরাতে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে পড়লে, চোখ বুজে ভাবতে লাগলেন পুরনো হারিয়ে যাওয়া পরিবেশের সকল কিছু যা তার পরম আত্মীয়ের মত ছিল, আজ আর তার কিছুই নেই। জীবনের প্রথম পর্বে দেশের বাড়ি-ভিটেমাটি – শেষ বয়সে এসে তার ছোঁয়া পেয়েও পরিবর্তনের ঢলে সব কিছু হারিয়েছেন। একটা অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরল। ঘুম হল না। ভোরের অনেক আগে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে বসলেন। বৃষ্টি থেমেছে। আকাশ এখনো কালো মেঘে ছেয়ে আছে। রাস্তায় জমা জল পায়ের পাতা অবধি। তিনি আপনমনে কুবো পাখির ডাক, কোকিলের কলরব, অস্পষ্ট রেলগাড়ির আওয়াজ, ব্যাঙেদের জলে লাফানো, ফুলের সুগন্ধ উপলব্ধি করতে লাগলেন। একটু পরেই পূব আকাশে সূর্য উঠল, কালো মেঘের আড়াল থেকে সোনালী রশ্মি প্রকৃতির সর্বাঙ্গ আলোকিত করে তুলল। হঠাৎ তার হাতের ওপর একটি নরম হাত স্পর্শ পেলে তিনি তাকিয়ে দেখলেন – নীলু এসেছে। ডান হাতের মুঠোতে ছাদ থেকে তোলা সদ্য ফোটা ফুলগুলো নীলমণির হাতে দিয়ে সে বলল

– “দাদা, তুমি কি কচ্ছ? গাছ দেখছ? আম্মো দেকবো”।

অপার আনন্দে নীলুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন নীলমণি। তাঁর অশ্রুজল আজ আর কোন বাঁধ মানলো না।

আরও পড়ুন >> মুঠোফোনে বন্দী প্রাণ >>

Facebook Comments

You Might Also Like