নিবন্ধ সাহিত্য

স্বামী বিবেকানন্দের সাংবাদিকতা-চর্চা (পর্ব ২/৬)- পৃথ্বী সেনগুপ্ত

ব্রহ্মবাদিন: স্বামীজীর উৎসাহেই মাদ্রাজ থেকে ইংরেজীতে, ‘ব্রহ্মবাদিন’ পাক্ষিক পত্রিকা হিসেবে ১৮৯৫সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে৷ যা পরে মাসিক পত্রিকা হয়৷ স্বামীজীর খুব কাছের অনুরাগী আলাসিঙ্গা পেরুমল এর কর্ণধার ছিলেন৷ স্বামীজীর আমেরিকা থেকে পাঠানো চিঠিগুলির মধ্য দিয়ে তার বক্তব্য সবাইকে জানানোর জন্যই মাদ্রাজ থেকে তার অনুগামীরা পত্রিকাটি ছাপাবেন বলে স্থির করেছিলেন৷ আমেরিকায় মহাসভার পর তিনি যখন ইংল্যাণ্ডে যান, তখন থেকে ব্রহ্মবাদিন প্রকাশ হতে শুরু করে৷ প্রথম সংখ্যায় পত্রিকার উদ্দেশ্য তথা আদর্শের কথায় বলা হয়েছে-“… Under the advice and with encouragement of Swami Vivekananda, it is proposed to start a weekly journal to be named the Brahmavadin. The main object of the journal is to propagate the Vedanta Religion of Indian and to work towards the improvement of the social and moral conditions of man by steadily holding aloft the sublime and universal ideas Hinduism….it shall be the the endeavour of the Brahmavadin to pourtray the Hindu ideal in the best and truest light in which it is found recorded in the historical sacred literature of the Hindus. Mindful of the fact that between the ideal of the Hindu Scripturs and the practical life of the Hindu peoples, there is a wide gulf of separation, the proposed new journal will constantly have in view how best to try to bridge that gulf and make the social and religious institutions of the country accord more and more with the spirit of that lofty divine ideal.” এই পত্রিকা প্রকাশের মূল সুর বিবেকানন্দের আর দু’টি পত্রিকার নীতিতে প্রবাহিত হলেও, ব্রহ্মবাদিনের ক্ষেত্রে ধর্ম-সাধনা, সংস্কৃত প্রধান রচনা বেশী করেই প্রাধান্য পেত৷ অবশ্য ভারতের নীতিকথাভিত্তিক প্রাচীন গল্পকথাগুলি যাতে ইংরেজীতে আরোও বেশী করে ব্রহ্মবাদিনের মধ্য দিয়ে জানতে পারে, সে বিষয়েও স্বামীজী উৎসাহী ছিলেন৷ হয়তো তিনি অনুভব করেছিলেন, একটি পত্রিকার সাহায্যে গল্পের ধরণ তথা বিষয়ের মধ্য দিয়ে নীতিকথাভিত্তিক হিন্দুধর্মের ইতিবাচক দিকগুলিকে বেশী সংখ্যক মানুষের কাছে আরো আকর্ষণীয় তথা গ্রহণযোগ্যতার সাথে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে৷ ‘ব্রহ্মবাদিন’ নাম আর তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “…নাম আর ‘মটো’ ঠিকই হয়েছে৷ বাজে সমাজসংস্কার নিয়ে ঘাটাঘাঁটি করো না, প্রথমে আধ্যাত্মিক সংস্কার না হলে সমাজসংস্কার হতে পারে না৷” (৩০শে জুলাই, ১৮৯৫, আলাসিঙ্গা)৷ পরে মতামত জানিয়ে আরো বলছেন, “ব্রহ্মবাদিনের’ দুটি সংখ্যা পেলাম-বেশ হয়েছে-এইরুপ করে চল৷ কাগজের কভারটা একটু ভাল করবার চেষ্টা কর, আর সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয় মন্তব্যগুলির ভাষাটা আর একটু হালকা অথচ ভাবগুলি একটু চটকদার করবার চেষ্টা কর৷ গুরুগম্ভীর ভাষা ও ছাঁদ কেবল প্রধান প্রধান প্রবন্ধগুলির জন্য রেখে দাও৷”…‘“তোমরা কাগজটার উপর পৃষ্ঠায় একটা পরিস্কার কভার দিচ্ছ না কেন বলতো৷ নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না৷ টাকাকড়ির লেনদেন বিষয়ে সম্পূর্ণ খাঁটি হও৷ তাড়াহুড়ো করে টাকা রোজগারেরর চেষ্টা করো না৷…আগামী মেলে কাগজটা সম্বন্ধে সব কথা আমায় লিখবে৷….বৈদিক সূক্তগুলি অনুবাদের সময়-ভাষ্যকাররা উহার কি অর্থ করেছেন, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখো…৷ ভক্তিযোগ সম্বন্ধে যতটা প্রবন্ধাকারে লেখা হয়েছে, সেগুলি অনেকটা প্রণালীবদ্ধ আকারে আছে, কিন্তু ক্লাসে যে সব বলা হয়েছে, সেগুলো অমনি এলোপাতাড়ি বলা হয়েছে-সুতরাং সেগুলো একটু দেখে শুনে ছাপাতে হবে৷ তবে আমার ভাবগুলোর উপর বেশী কলম চালিও না৷  “ভক্তিযোগ”টা বহুদিন ধরে তোমাদের কাগজের খোরাক যোগাবে৷”’-এই চিঠির শেষে তিনি আবার নির্দেশও দিচ্ছেন, আমাদের ঋষিদের জ্ঞান অনুসারে কোনো বিষয়কে ব্যাখা করার জন্য ভাষ্যকারগণর থেকে ভাষার বিষয়ে ব্যাখা জেনে নেওয়া উচিত৷ ‘ব্রহ্মবাদিন’ পত্রিকা-সংক্রান্ত ইত্যাদি আরো নানান বিষয়েই স্বামীজী খোঁজখবর নিতেন এবং পরামর্শও দিতেন৷ প্রবন্ধ, অর্থ, সংবাদপত্রের লে-আউট থেকে শুরু করে তার গ্রহণযোগ্যতা-সব বিষয়েই তিনি সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল থাকতেন সবসময়ই৷

১ই নভেম্বর, ১৮৯৫, লণ্ডন থেকে আলাসিঙ্গাকে ‘ব্রহ্মবাদিন’ পত্রিকা সম্বন্ধে জানাচ্ছেন, “…আমি ইতিমধ্যেই খবর পেয়েছি যে, আমেরিকায় উহার অনেকগুলি গ্রাহক হয়েছে৷ ইংলণ্ডেও কতকগুলি গ্রাহক যোগাড় করে দেবো৷…ইংরাজেরা খবরের কগজে বেশী বকে না, কিন্তু তারা নীরবে কাজ করে৷ ….ব্রহ্মবাদিনের প্রত্যেক সংখ্যায় ভক্তি, যোগ ও জ্ঞান সম্বন্ধে কিছু লেখা বেরুনো দরকার৷….আরও কতকগুলো বিজ্ঞাপন জোগাড়ের চেষ্টা কর-বিজ্ঞাপনের জোরেই কাগজ চলে৷…ব্রহ্মবাদিনে বিবিধ সংবাদের একটা স্তম্ভ থাকা উচিত৷” ১০০বছরেররও বেশী সময় আগে দাঁড়িয়ে তার উপলব্ধিতে ছিল, কাজ করতে গেলে দরকার অর্থেরও; এবং কিভাবে তা আসতে পারে সে সম্বন্ধেও দিক নির্দেশ করে যাচ্ছিলেন তিনি নিজেই৷ এ বিষয়ে পরে আরো আলোচনা করা হয়েছে৷

প্রবুদ্ধ ভারত: ব্রহ্মবাদিনের পর ১৮৯৬সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয় ‘প্রবুদ্ধ ভারত’৷  ‘প্রবুদ্ধ ভারত’-র সম্পাদক রাজম আইয়ারের মৃত্যুতে পত্রিকা, ১৮৯৮র মে মাসে বন্ধ হয়ে যায়৷ ১৮৯৮র অগাস্ট থেকে স্বামীজীর নির্দেশেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রথম ইংরেজি মুখপত্র হিসেবে, স্বামী স্বরুপানন্দের সম্পাদনায় আলমোড়া থেকে ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ নতুনভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে৷ স্বামীজী এই উপলক্ষ্যে তার বিখ্যাত কবিতা To The Awakened India লিখেছিলেন৷ পত্রিকার আদর্শ ছিল-“Arise | Awake | and stop not till the goal is reached.” পরে এর কার্যালয় পরিবর্তিত হলেও পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিতে স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের ধারাবাহিকতা আজও নিরবিচ্ছিন্ন রয়েছে৷ উল্লেখ্য, বিবেকানন্দের শিষ্য সন্ন্যাসী বিমলানন্দ প্রবুদ্ধ ভারত পত্রিকায় লিখতেন এবং লেখা সম্পাদনাও করতেন৷ স্বয়ং বিবেকানন্দ দ্বারা প্রশংসিত ইংরেজি ভাষায় তাঁর দক্ষতা এবং সম্পাদকীয় ক্ষেত্রে সম্পাদনায় তাঁর নিরলস সহযোগিতা (সম্পাদক ছিলেন স্বামী স্বরুপানন্দই) পত্রিকাটির মানের উন্নতিতে অনেকখানিই সাহায্য করেছিল৷ ১৯২৩ সাল পর্য্যন্ত ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ প্রথমে আলমোড়া এবং তারপর মায়াবতী থেকে বেরিয়েছিল৷ ১৯২৪ থেকে ইংরেজী মাসিক ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ কলকতা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে৷ ১৮৯৮ থেকে এর পরিচালনাভার গ্রহণ করে রামকৃষ্ণ মিশন৷

পত্রিকার প্রথম সংখ্যায়, প্রবুদ্ধ ভারত নামের পাশে তারকা চিন্হ দিয়ে লেখা ছিল, “a name suggested by Swami Vivekanada, which, while means Awakened India, also indicates the close realationship that exists between Hinduism amd Buddhism.” প্রবুদ্ধ শব্দের অর্থ উদ্বুদ্ধ, চেতনাপ্রাপ্ত বা জাগরিত৷ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয়েছে, “…the eyes of the western world were themselves turned towards India, turned, not as of old for the gold and silver she could give, but for the lasting treasures contained in her ancient sacred literature. Christian Missionaries in their eagerness to vilify the Hindu, had opened an ancient magic chest, the very smell of whose contents caused them to faint. Oriental scholars, the Living-stones of eastern literature, had unwittingly invoked a diety, which it was not in their power to appease…The discovery is published, pilgrims multiply. A Sannyasin from our midst carries the altar-fire across the seas. The spirit of the Upanishads make a progress in distant lands. The procession develops into a festival. Its noise reaches Indian shores and behold our motherland is awakening.”  অবশ্য এই ভাবানুসারী যে ছবি ‘প্রবুদ্ধ ভারত’র প্রচ্ছদের জন্য আঁকা হয়েছিল, স্বামীজীর তা পছন্দ হয়নি৷

১৮৯৬সালে, THE JOURNAL OF THE MAHA-BODHI SOCIETY থেকে ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ সম্পর্কে একটি মূল্যায়ণ ছাপা হয়, যা পড়লে পত্রিকাটি সম্বন্ধে একটা ধারণা লাভ করা যেতে পারে-“One chief characteristic of the paper is that it has no prejudice or bigotry against any religion…The paper will principally depict the religion of Vedanta, and will be a vehicle for spreading the Vedanta religion with as much clearness as possible. Attempts have been made in the paper to bring home, in the heart of the people, the noble truths, in the form of stories, history and other simple and interesting manner…The paper is free from all sorts of narrowness and ezclisove ideas of religion…The subjects discussed are all very useful and interesting; and the wealth of thought, nobleness of tone, and breadth if views are visible to a marked degree.”

ভারত থেকে প্রকাশিত এই দৃষ্টিভঙ্গীগুলি ছাড়াও স্বামীজীর বিদেশ থেকে পাঠানো চিঠিগুলি পড়লেই বোঝা যায়, যে তার বিশাল আদর্শের পরিপূরকই ছিল এই দু’টি ইংরেজী পত্রিকা৷ স্বামীজী দু’টি পত্রিকার মধ্য দিয়েই সমগ্র বিশ্ব তথা ভারতবাসীর সাথে ব্যক্তি-মানুষের কর্ম-সাধনার যোগসূত্রের কথা বলেছিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ প্রচারের জন্য এবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল মাতৃভাষা বাংলায় একটি সংবাদপত্র প্রকাশের৷

পড়ুন>> স্বামী বিবেকানন্দের সাংবাদিকতা-চর্চা (পর্ব ১/৬) >>

আরও পড়ুন >> শক্তিনির্ভেদ >>

আরও পড়ুন >> স্বামী বিবেকানন্দের সাংবাদিকতা-চর্চা (পর্ব ৩/৬) >>

Facebook Comments

You Might Also Like