নিবন্ধ সাহিত্য

স্বামী বিবেকানন্দের সাংবাদিকতা-চর্চা (পর্ব ১/৬)- পৃথ্বী সেনগুপ্ত

ভারতীয় মনীষীদের এক-একজনের কর্মজীবন এবং তাদের পদচারণার পরিসর এমনই এক-একটি সুবিশাল অধ্যায় যে তাকে কোনো বাধাঁধরা কাঠামোয় বিচার-বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না অনেকসময়ই৷ তা সত্ত্বেও প্রত্যেকটি মানুষই চায় এদেরকে নিজেদের মত করে কাছে টেনে নিতে৷ এই চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই স্বামী বিবেকানন্দের স্বরুপ ব্যাখা হয়েছে বিভিন্ন রুপে ও ভাবে৷ শিকাগোর ধর্মসভা থেকে যে মহামানবের বিশ্ববিজয়ের শুরু তার প্রেক্ষাপটেও রয়েছে অজস্র জীবন-সংগ্রাম৷ মানুষের কর্ম আর আত্মপ্রত্যয় যখন তাকে পার্থিব আশা-আকাঙ্ক্ষার ওপরে নিয়ে গিয়ে নতুনতর জীবন উপলদ্ধির সম্মুখীন করায়, তখন তার কর্মের সাথে জড়িত নানান কাজগুলি আমাদেরকে বারংবার দেয় বিশ্লেষণের অন্তর্নিহিত তাগিদ৷ বিবেকানন্দের ক্ষেত্রেও এই ব্যতিক্রম ঘটেনি কখনোই৷ যদিও সাংবাদিতার ক্ষেত্রে তার অবদান সম্পর্কিত আলোচনা খুবই কম হয়েছে এ পর্যন্ত; কারণ সরলরৈখিকভাবে এ পেশার আদর্শ-নৈতিকতা-লেখা-পরিচালনা প্রভৃতি আরো যে-যে প্রাথমিক ভিত্তিগুলি আছে, সেখানে সুস্পষ্টভাবেই তাঁর অবদান যতটা না রয়েছে তার থেকেও অনেক বেশী স্বামীজীর লক্ষ্যপূরণের চিন্তাভাবনার যোগসূত্রের দিক থেকে এই জগতটি বেশী সম্পর্কিত হয়ে রয়েছে৷ বাস্তব জীবন থেকে পরিপুষ্ট তার দার্শনিক বোধই সমান্তরালভাবে সাংবাদিকতা জগতকে দিয়ে গেছে নব্য মাত্রা এবং সেইদিক থেকেই এই বিষয়টিকে এখানে আলোচিত৷ তাই আপাত ও বাহ্যিকভাবে স্বামী বিবেকানন্দের পত্রিকা চালু বা পরিচালনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত লাভ-লোকসান বা নীতি-আদর্শের দিক খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় কখনোই৷ তাঁর জীবন তথা প্রেক্ষিতের দিক থেকে এই আলোচনা সেই ইচ্ছাপুষ্টও নয়৷

একদিকে দেশে স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বাংলায় নবজগরণের শেষ পর্যায়ের চূড়ান্ত প্রকাশ – বিবেকানন্দ সেই প্রকাশকে বিশ্বের কাছে আরও তীব্রতর করে তুলতেন হিন্দু ধর্মের সংস্কারের ইতিবাচক দিকগুলিকে নিজের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে৷ যেখানে বারবার ঘুরে ফিরে এল দারিদ্র – দীর্ঘসময় ধরে শোষিত ভারতের সাধারণ গরীব মানুষের কথাই৷ নতুনতর এই স্বাধীনতার আশ্বাস আরো বেশী করে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দরকার পড়ল মুদ্রণ মাধ্যমের৷  স্বামী বিবেকানন্দ যে তিনটি পত্রিকা পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন সেগুলি হল – ব্রহ্মবাদিন(১৮৯৫), প্রবুদ্ধ ভারত(১৮৯৬) আর উদ্বোধন(১৮৯৯)৷ এই তিনটি পত্রিকার নামকরণ তাঁর নিজেরই করা৷

প্রবাসে থাকাকালীন: বিবেকানন্দ সরাসরিভাবে সংবাদপত্র পরিচালনার কাজে যুক্ত ছিলেন খুব অল্প সময়৷ স্বল্পায়ু এই মানুষটির জীবনের (১৮৬৩-১৯০২) সিংহভাগই কেটেছে সারা পৃথিবীতে সমাজ সংস্কারের কাজেই ঘুরে-ঘুরে৷ কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের যে অপরিসীম ক্ষমতা আছে, সে বিষয়ে তিনি শুধু সচেতনই ছিলেন না, বারংবার তার কর্মানুসারীদেরও সে বিষয়ে সচেতন করে দিতেন৷ তাই সংবাদপত্র-পত্রিকা-সাময়িক প্রভৃতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গী বা নির্দেশাবলীগুলিই এই আলোচনার ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিক হিসেবে তার স্বরুপ নির্ণয়ে আমাদেরকে অনেকখানি সাহায্য করতে পারে৷

শিকাগো ধর্মসভার অনুষ্ঠানের পরে বিবেকানন্দ আমেরিকায় বেশ কিছু দিন সময় ছিলেন, হিন্দু ধর্মের সংস্কার-প্রচার আর বক্তৃতার মাধ্যমে দেশের কাজে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে৷ এইসময় সেখানকার বিভিন্ন সংবাদপত্রই এ বিষয়ে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল৷ তখনকার ইংরেজী সংবাদপত্রের কাছে স্বামীজীর অনেক বক্তব্যই মনোঃপুত হয়নি কারণ তা সরাসরি আঘাত করছিল মানুষের রক্ষণশীল ধারণাকে৷ তবে তিনি এ বিষয়ে ভীষণভাবেই সচেতন ছিলেন এবং বক্তব্যগুলিকে গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গীতেই গুরুত্ব দিয়ে তার সমালোচনা করতেন, যাতে তার বিশাল উদ্দেশ্যটি ব্যর্থ না হয়৷ ভারতেও তিনি এই বিষয়ে তার শিষ্য-অনুগামীদেরকে অসংখ্য চিঠিপত্র লিখেছিলেন নিজ অভিমত ব্যক্ত করে৷ তার এই লেখনীর মধ্য দিয়ে সম্পাদকীয় নীতি তথা সাংবাদিকতা প্রভৃতি আরো এই ধরণের বিভিন্ন প্রসঙ্গে তার অবস্থানের স্বরুপ নির্ণয় করা যায়৷ যেমন, স্বামীজী এক চিঠিতে (১৮৯৪) তাঁর মাদ্রাজী ভক্তদের লিখেছেন, “ইন্টেরিয়র পত্রিকার যে সমালোচনা করিয়াছ তাহা সমুদয় আমেরিকাবাসীর ভাব বলিয়া বুঝিও না৷ এই পত্রিকা এখানে কেহ জানে না বলিলেই হয়, আর ইহাকে এখানকার লোক ‘নীল নাসিক প্রেসবিটেরিয়ান’ কাগজ বলে৷ …সাধারণ যাহাকে আকাশে তুলিয়া দিতেছ, তাহাকে আক্রমণ করিয়া একটু বিখ্যাত হইবার ইচ্ছায় এই পত্রিকা ঐরুপ লিখিয়াছিল”

আমেরিকায় থাকাকালীন তিনি তার মঠের সন্ন্যাসীদের নির্দেশ দিতেন, তার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে কারো কোনো লেখাকেই যেন বেশী গুরুত্ব না দেওয়া হয়৷ কাজটাই আগে৷ এক পত্রে তিনি বলছেন – রিপোর্টারকে দেখাসাক্ষাৎ না করতে দিলে সে নিজের কল্পনা মত কিছু উল্টোপাল্টা লিখে ছাপিয়ে দেবে৷ তাই আমেরিকার কাগজ থেকে কিছু তুলে ছাপাবার সময় সাবধান৷ এইরকমই পত্রাবলীর সূত্রে জানা যায় (১৮৯৫ সালে আলাসিঙ্গাকে), “নিউইর্য়ক থেকে ‘দার্শনিক পত্র (Metaphysical Magazine) বলে একখানা নূতন কাগজ বের হয়েছে – ওখানা বেশ ভাল কাগজ৷ পল কেরসের কাগজটা মন্দ নয়, তবে ওর গ্রাহক সংখ্যা ওখানে বড় কম”৷ “…ভারতে বর্ত্তমান ধর্মের সম্বন্ধে বেশ সুন্দর ওজস্বী অথচ বেশ সুরুচিসঙ্গত একটা প্রবন্ধ লেখ আর উহা আমেরিকার কোন সাময়িক পত্রে পাঠিয়ে দাও”৷ আবার লন্ডন থেকে লেখা এক পত্রে তিনি জানাচ্ছেন, ‘স্ট্যাণ্ডার্ড’ পত্রিকা সেখানকার রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ শক্তিশালী কাগজ যা সেই সমাজের মানুষদের মধ্যে তার বক্তৃতার প্রভাব বিষয়ে লেখা ছেপেছে৷ অর্থাৎ সমাজে সংবাদপত্রের প্রচার-প্রভাব বিষয়ে তিনি যথেষ্টই সচেতন ছিলেন৷ শুধু তাই নয়, আমেরিকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁর অনেক মৌখিক বক্তৃতা-বক্তব্য তিনি সংগ্রহ করে দেশে পাঠাতেনও৷ যার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে সব একত্রিত করে প্রকাশ করার৷ একটা সংগঠন তৈরি করে প্রচারের ক্ষেত্রে প্রকাশনার কতটা গুরুত্ব তা তার এই বক্তব্যগুলি থেকেই স্পষ্ট হয়৷

স্বামীজী কিন্তু প্রচারের জন্য বিদেশে এক জায়গায় বেশীদিন থাকতেন না৷ ফলে এই ধরণের প্রতিবেদন সংগ্রহ করার কাজটা মোটেই মৃসণ ছিল না৷ তিনি এই কাজের মধ্যে শুধু বিদেশের পত্র-পত্রিকার সমালোচনাই নয়, দেশেরও পত্র-পত্রিকাতেও তার সম্বন্ধে কি ছাপা হচ্ছে সে বিষয়েও বিদেশ নানান জায়গায় থাকাকালীন খবর নিতেন৷ ১৮৯৫ সালের ১৭ই জানুয়ারী এক পত্রে স্বামীজী উল্লেখ করছেন, “তোর টিবেটের (তিব্বতের) কি খবর৷ ‘মিরারে’ ছাপা হলে আমাকে একখানা পাঠিয়ে দিস” এখানে মিরর হল ইণ্ডিয়ান মিরর পত্রিকা, যা পড়ে তিনি বলেছিলেন, লেখা ভালো হয়েছে৷ বাংলা আর ইংরেজীতে তর্জ্জমার বিষয়ে সংশোধনও করে দিয়েছিলেন সেই চিঠির মধ্য দিয়েই (সাল ১৮৯৬, ১৪ই এপ্রিল)৷ পারিপার্শ্বিক সময় সমাজের ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার যে গুরুত্ব আছে, তা তার এই মনোভাব থেকেই স্পষ্ট হয়৷ প্রয়োজনে আবার তৎকালীন ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্যের প্রতিবাদসুলভ গঠনমূলক সমালোচনা করেছিলেন (৬ এপ্রিল, ১৮৯৭র পত্র)৷ সেই সমালোচনার ধার প্রয়োজন বিশেষে অত্যন্ত বেড়ে যেত এবং সময়বিশেষে তার দরকারও পড়ত – “এখানে একটি পাগলাটে, ধুতিপরা মারহাট্টা ব্রাহ্মণ মেলায় কাগজের উপর নখের সাহায্যে প্রস্তুত ছবি বিক্রয় করিতেছিল৷ এ লোকটা খবরের কাগজের রিপোর্টারদের নিকট রাজার বিরুদ্ধে নানা কথা বলিয়াছিল – এ ব্যক্তি খুব নীচ জাতি, এই রাজারা ক্রীতদাসস্বরুপ, ইহারা দুর্নীতিপরায়ণ ইত্যাদি; আর এই সত্যবাদী সম্পাদকেরা – যাহার জন্য আমেরিকা বিখ্যাত – এই লোকটার কথায় কিছু গুরুত্ব আরোপের ইচ্ছায় তার পরদিন সংবাদপত্রে বড় বড় স্তম্ভে বাহির করিল, তাহারা ভারতাগত একজন জ্ঞানী পুরুষের বর্ণনা করিল-অবশ্য আমাকেই তাহারা লক্ষ্য করিয়াছিল – আমাকে তাহারা স্বর্গে তুলিয়া দিয়া আমার মুখ দিয়া এমন সকল কথা বাহির করিল, যাহা আমি কখন স্বপ্নেও ভাবি নাই; তারপর এই রাজার সম্বন্ধে ব্রাহ্মণটি যাহা যাহা বলিয়াছিল, আমার মুখে সব বসাইল৷ আর তাহাতেই চিকাগো সমাজ একটা ধাক্কা খাইয়া তাড়াতাড়ি রাজাকে পরিত্যাগ করিল৷ এই মিথ্যাবাদী সংবাদপত্র-সম্পাদকেরা আমাকে দিয়া আমার স্বদেশীকে বেশ ধাক্কা দিলেন৷ ইহাতে আরো বুঝাইতেছে যে, এই দেশে টাকা অথবা উপাধির জাঁক-জমক অপেক্ষা বুদ্ধির আদর বেশী৷” (২০শে আগস্ট, ১৮৯৩, ম্যাসাচুয়েটস থেকে আলাসিঙ্গা পেরুমলকে লেখা পত্র৷ আলাসিঙ্গা-স্বামীজীর মাদ্রাজবাসী অনুগত শিষ্য৷ আমেরিকা যাওয়ার জন্য স্বামীজীর মাদ্রাজের অনুগতদের মধ্যে অন্যতম অর্থ সংগ্রহকারী ব্যক্তি) আর এক পত্রে তিনি বলছেন, “…মধ্যে এক দিগগজ পত্র লেখেন – তা আমি অর্দ্ধেক পড়িতে পারি না – ইহা আমার পক্ষে পরম মঙ্গল৷ কারণ, অধিকাংশ খবরই এই ডৌলের যথা-“অমুক-র দোকানে বসে অমুক-আপনার বিরুদ্ধে এই সকল কথা বলিতেছিল”। অনুগামী আলাসিঙ্গা প্রসঙ্গে অন্য এক পত্রে তিনি বলছেন, “…আলাসিঙ্গার প্রেরিত একটা তিন বর্গ-ইঞ্চি কাগজে টুকরো ছাড়া আমি একখানা ভারতীয় খবরের কাগজেও আমার সম্বন্ধে কিছু বেরিয়েছে-তা দেখি নি৷ অন্যদিকে, ভারতের খ্রীষ্টিয়ানরা যা কিছু বলছে মিশনারিরা তা খুব যত্ন করে সংগ্রহ করে নিয়মিতভাবে প্রকাশ করছে এবং বাড়ী বাড়ী গিয়ে আমার বন্ধুরা যাতে আমায় ত্যাগ করেন, তার চেষ্টা করছে৷…ভারত থেকে হিন্দু পত্রিকাগুলো আমাকে আকাশে তুলে দিয়ে প্রশংসা করতে পারে, কিন্তু তার একটা কথাও আমেরিকায় পৌঁছয় নি”৷

লন্ডনে থাকাকালীন কলকাতার খবর নেওয়ার সময় এন. ঘোষের ‘নেশন পত্র’ তার স্বপক্ষে লিখছেন শুনে তিনি খুশীই হয়েছিলেন৷ তার কাজের বিষয়ে ইণ্ডিয়ান মিরর পত্রিকার সম্পাদকের সমর্থনের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধও জানিয়েছিলেন৷ বিদেশে থেকেও মাদ্রাজের প্রধান আংলো-ইণ্ডিয়ান পত্রিকা ‘মান্দ্রাজ মেলে’ তার রাজযোগ বইয়ের যে ইতিবাচক সমালোচনা (Review) বেরিয়েছে সে বিষয়েও স্বামীজী অবগত ছিলেন৷ আবার তার কাজের বিরুদ্ধে কিছু কিছু সংবাদপত্রের অযৌক্তিক-ভিত্তিহীন-একপেশে ভূমিকাতেও অসন্তোষ ব্যক্ত করেছিলেন – “ভারতের এই সংবাদপত্রগুলি আমাকে শেষ না করে ছাড়বে না দেখছি৷ কবে কি খেয়েছি, কখন হেঁচেছি-সব কিছু ছাপাবে”৷ তাঁর নিজের কাজ-বক্তৃতা সমাজ ও সংবাদপত্রগুলি কিভাবে দেখছে সেটা যেমন গুরুত্ব-সহকারে তিনি জানতে চাইতেন, তেমনি অপরদিকে নিজের সংবাদপত্র প্রকাশ করে কিভাবে সেই উদ্দেশ্যপূরণ করা যায় সেদিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল৷ স্বামীজীর এই সময়কার কাজকর্ম, চিন্তা-ভাবনা, বক্তৃতা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদন ভারতবর্ষ থেকে প্রকাশিত হচ্ছিল৷ অবশ্য বিবেকানন্দের সাংবাদিকতা চর্চার প্রেক্ষিত থেকে আলোচনায় তার গুরুত্ব কম৷ বরং আমরা যদি তাঁর সেই সময়কার চিন্তা-ভাবনা সম্বন্বিত চিঠিপত্র তথা মঠ-ভক্তদেরকে দেওয়া নির্দেশাবলীগুলিকে অনুসরণ করি, তবে সাংবাদিকতার প্রেক্ষিতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর স্বরুপকে খানিকটা চেনা যাবে (উল্লেখ্য, উদ্বোধন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত স্বামীজীর বাণী ও রচনার নতুন সংস্করণে, ১২ই অগাস্ট ১৮৮৮ থেকে ১৪ই জুন ১৯০২ অবধি স্বামীজী রচিত মোট ৫৫২টি পত্র পাওয়া যায়)৷ সেই অর্থে সম্পাদক-লেখক বা সাংবাদিক বিবেকানন্দের থেকেও এখানে বাংলার সাংবাদিকতা অনেক বেশি গৌরাবান্বিত হয়ে উঠে, যখন আমরা কর্মই জীবন এবং তাঁর আরো অনেক মৌলিক চিরসত্য-সমন্বিত আধারের ওপর তাকে আলোচনা করে থাকি বা করতে পারি৷ তাই, বিশাল মাপের অনুভূতিসম্পন্ন এক মানুষ যেখানে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন সেখানে তার সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত বিষয়গুলির পর্যালোচনা করাটাও অনেকসময় গৌণ হয়ে পড়ে৷ এই আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা উচিত, লেখক-সাংবাদিক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল এখানেই ব্যতিক্রমী, যা শুধু নিজের কথা নয়, তা সমাজকেও তুলে ধরেছিল আর সেই সমাজের মানুষের কথা বলেছিল৷ ইংরেজ সরকারের সমালোচনাকারী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া এবং সম্পাদকের দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন৷ অর্থাৎ, স্বামীজী শুধু ধর্ম বা সমাজ নয়, সচেতন ছিলেন ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধেও৷ সংবাদপত্র যে সমাজকে প্রতিফলিত করে তার নানা দিকের সঙ্গেই বিবেকানন্দের ছিল নিবিড় যোগাযোগ৷ তবে সংবাদপত্রের মধ্য দিয়ে নিজেদের কুসংস্কার-আচার প্রভৃতি বিষয়গুলির শোধরানোর কর্মপ্রচেষ্টাকে বিদেশের কাছে তুলে ধরার ব্যাপারকে তিনি মোটেই সায় দিতেন না৷ বিনা কর্মে বাহ্যিক আড়ম্বর প্রকাশের ক্ষেত্রে বিবেকানন্দের প্রবল আপত্তি ছিল৷ তাঁর পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য অবশ্যই অর্থ উপার্জন করা ছিল না, ছিল হিন্দু ধর্ম-জাতি-সংস্কার আর ঐতিহ্যের ভালো দিকগুলোকে সবার সামনে তুলে ধরা৷ বিদেশে যার প্রয়োজনীয়তা তিনি নিজেই পূরণ করেছিলেন৷ আর ভারতে তা করছিল বিবেকানন্দের ভাবধারায় পরিপুষ্ট তার অনুগামীরা, শিষ্যরা তথা এই পত্রিকাগুলি৷  ফিরে যাওয়া যাক ভারতে, সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত মূল কর্মকাণ্ডের দিকে৷

আরও পড়ুন >> স্বামী বিবেকানন্দের সাংবাদিকতা-চর্চা (পর্ব ২/৬) >> Coming Soon ২২ মে, ২০২০

আরও পড়ুন >> শক্তিনির্ভেদ >>

Facebook Comments

You Might Also Like