ছোটগল্প সাহিত্য

পার্থক্য – অনুভা নাথ

★১★

সূর্য্য উদয় হওয়ার আগেই সচরাচর ঘুম ভাঙে চন্দনার। সকালে একটু দেরী হওয়ার জো নেই। পাঁচবাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ করা কি কম ঝক্কি? রাতে মাঝে মাঝেই মায়ের কাশির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। তারপর রাতের অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দারিদ্র্যের চিন্তা মনের মধ্যে বুজকুড়ি কাটতে থাকে। ভাবতে ভাবতে কখন আবার দু’চোখের পাতা এক হয়ে যায় বুঝতে পারে না চন্দনা।

★২★

অফিসের জন্য দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলে সুপর্ণা, আজ অফিসে বেশ কিছু কাজ আছে। কাল রাতে অনিমেষের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ফোনে গল্প করেছে, তাই সকালে ঘুম ভাঙতে দেরী হলো, ফলস্বরূপ অফিসেও দেরী করে পৌঁছাবে। নেহাত সরকারী চাকরি, না হলে তো অর্ধেক মাইনেই কাটা যেত!
তারমধ্যে ক’দিন ধরেই নিম্নচাপের দরুন একটানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে। কোনও কাজ করতে মন লাগছে না। এত রোমান্টিক ওয়েদার। অনিমেষ কিছুদিন ধরেই ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছে। প্রথমে মুভি,তারপর লাঞ্চ সবশেষে একটু শপিং। সুপর্ণাই বারবার না করছিল। আসলে মায়ের শরীরটা ক’দিন ধরে ভালো নেই। হাঁপানীর সমস্যাটা বেড়েছে। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছে।সুপর্ণার মন পড়ে থাকে মায়ের জন্য।

★৩★

আজ সকাল থেকে মায়ের শরীরটা ভীষণ খারাপ করছে। চন্দনা কাছাকাছির ডাক্তারখানায় নিয়ে যাবে বলে ঠিক করেছিল। এরপর বেশী বাড়াবাড়ি হলে চন্দনার পক্ষে সামাল দেওয়া সত্যিই মুশকিল হয়ে পড়বে। এদিকে মাসের শেষ, বাড়িভাড়া একমাসের বাকী পড়ে আছে। পল্টু চন্দনাকে আজ দু’দিন ধরে বলেছে সে কিছু সাহায্য করতে পারে, না হয় ধার হিসাবেই চন্দনা যেন কিছু কিছু টাকা রাখে।
কিন্তু চন্দনা পল্টুর কাছ থেকে টাকা নিতে চায় না। নিজেকে ছোটো মনে হয় ওর। পল্টু সাইকেলের দোকানে কাজ করে। কতই বা পায়? ওরও তো মা আছে বাড়িতে। চন্দনা, পল্টু এদের দু’জনের সংসারেই অভাব অনটন নিত্য সঙ্গী। আজ মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেই হবে, চন্দনা ত্রস্ত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। জীর্ণ মলিন সালোয়ার কামিজের ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। ওর অযত্নলালিত লালচুলগুলো হাওয়ায় উড়তে থাকে। তাড়া থাকলেও দ্রুত হাঁটতে পারে না, শত তাপ্তি দেওয়া চটি পড়ে এর থেকে জোরে হাঁটা যায় না।

★৪★

দরজায় কলিং বেলের শব্দে সুপর্ণা দরজা খোলে। বাইরে চন্দনা দাঁড়িয়ে।

– “কিরে,আজ এত দেরী করলি কেন?”

– “দিদি,মায়ের খুব শরীর খারাপ, কিছু টাকা পেলে ভালো হতো।”

-“আবার, তোর নাটক শুরু হলো? সকালবেলা একে দেরী করে এসেছিস্, এই মাসে কতগুলো কামাই আছে জানিস্? আমি অফিসে যেদিন যাই না মাইনে কাটা যায়,আমরা তো তোর মাইনে কাটি না, প্রত্যেক দিন নতুন বাহানা।”
সুপর্ণা অফিস যাওয়ার জন্য তৈরী হতে হতেই এই কথাগুলো চন্দনার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিচ্ছিলো।
আজকাল এগুলো চন্দনার সহ্য হয়ে গেছে। এটোঁ বাসন ধুতে ধুতে কখন যেন নিজেকে মূল্যহীন, ব্রাত্য বলে নিজেই গণ্য করে নিয়েছে। ওদের কথায় কষ্ট হয় না আর, তবুও যদি এত কথা শোনাবার পর দিদি দয়াপরবশতঃ হয়ে কিছু দেয়। চন্দনা তাতেই খুশী।

সুপর্ণা আর চন্দনা দু’জনে প্রায় সমবয়সী। বয়স আর লিঙ্গ ছাড়া দু’জনের আর কিছুই মেলে না। আর্থিক ব্যবধান ওদের দু’জনকে সম্পূর্ণ দুটো অন্য জগতের বাসিন্দা করে তুলেছে।
মাঝে মাঝে চন্দনা ভাবে, শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণেই সুপর্ণার সাথে চন্দনার এত পার্থক্য।চন্দনা এবং ওর মাকে অতিক্রম করে ওদের জীবনে দারিদ্র্য যেন অনেক বেশী করে রয়েছে।

★৫★

আজ সকাল থেকেই আবহাওয়া দারুন। হেমন্তের একটা শিহরণ আছে, তার সাথে উজ্বল দিনের চকচকে ভাব যেন বেশী করে ফুটে উঠেছে।
সুপর্ণা আজ অফিস কামাই করবে।অনিমেষের সঙ্গে “ডে আউট”-এ যাবে। আরও একটু বেলার দিকে অফিসে ফোন করে জানাবে, মা অসুস্থ, মায়ের কথা বললে অফিসে কেউ আর কোনো কথা বলবে না।
কিন্তু চন্দনা যে এখনও কাজ করতে এলো না, এরপর দেরী করলে সুপর্ণাকেই সব কাজ করতে হবে।
নাহ্ এবার একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সুপর্ণা রাগে গজগজ করতে করতে ঘরের কাজ করতে শুরু করে দেয়। ওর সদ্য ম্যানিকিওর করা নখগুলো বাসন মাজতে গিয়ে কিঞ্চিৎ বিবর্ণ হয়ে পড়ে। সুপর্ণা শেষপর্যন্ত ওর মাকে বলে, “মা, আর নয়, চন্দনা প্রত্যেকদিন ওর মায়ের শরীর খারাপের মিথ্যা বাহানা করে কামাই করে, এসেই টাকা চায়, এবার কাজে এলে বলে দিও, ওকে আমরা আর এবাড়িতে কাজে রাখব না।” দ্রুত স্নানঘরে ঢুকে যায় সুপর্ণা, এরপর দেরী হলে সিনেমার ‘বিগিনিং’টা মিস্ হয়ে যাবে। শহরের অন্যপ্রান্তে, চন্দনা অশ্রুসজল চোখে ওর ছোটো খুপরি থেকে বেরিয়ে কাজের বাড়িগুলোর উদ্দেশ্যে দৌঁড়াতে থাকে।মায়ের আজ ভীষণ অসুখ। কিছু টাকা যেভাবেই হোক ধার করতেই হবে। মাকে না হলে হয়তো আর……
চন্দনা কিছু আর ভাবতে পারে না। মুহূর্তের মধ্যে ওর চোখের সামনের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে যায়। হেমন্তের সকালে হঠাৎ করেই একটু বেশী ঠান্ডা অনুভূত হয় ওর।


parthokko anuva nath
Facebook Comments

You Might Also Like