ছোটগল্প সাহিত্য

একটি প্রেমের গল্প ও রবীন্দ্রনাথ – অনুভা নাথ

“আমার পরাণ যাহা চায়”
রকম ঘুমন্ত সুরে গানটা কে গাইছে? আমার মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ঘুমিয়ে পড়ব।oh God, give me a brake!

ব্রেটনি স্পেয়ার্সের নিউ অ্যালবামটা শুনে আমার কান ও মনকে শুদ্ধ করতে হবে।
ওহ্ আমার intro দেওয়া হয়নি। intro মানে introduction, জেট প্লেনের যুগে পুরো কথা কেউ বলে নাকি?
যাক গে, আমি সমরেশ দত্ত। in short স্যাম। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছি। সমরেশ আবার একটা নাম হলো? আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ি। নামটা আমার grand father দিয়েছিলেন। বাংলায় সমরেশ বসু নামে একজন বিখ্যাত লেখক ছিলেন, তাঁর নামেই আমার নাম। আমি নামটাকে ছোটো করে নিয়েছি।

বাংলা একটা অদ্ভুত ভাষা,উফ্ মা যখন ছোটোবেলায় আমায় বাংলা পড়ানোর চেষ্টা করতো, তখন আমার কান্না কান্না অবস্থা হতো।কিসব কঠিন pronunciation, তার ওপর আবার যুক্তাক্ষর না কি সব যেন বলে! এককথায় হরিবল্!!

যাই হোক, ঐ গানটায় ফেরা যাক্। মেয়েটির গলা বেশ ভালো। ঐ গলায় রিহানার গান দারুন মানাবে। কিন্তু ঘ্যানঘ্যানে সুরে ওটা ও কি গাইছে?
এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে মায়ের সাথে রবীন্দ্রজয়ন্তী celebration এ ঢুকে পড়েছি,বুঝিনি।
হঠাৎ খেয়াল করলাম, স্টেজে শাড়ী পরে একটি মেয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছে। মে মাসের গরমটা হঠাৎ করে যেন কমে গেল। মনের মধ্যে অজস্র তুষারপাত হতে লাগলো। আমি স্টেজের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, মেয়েটির পিঙ্ক শেডের গায়ের রং, ঠোঁটটা তুলি দিয়ে আঁকা চোখগুলো অপূর্ব, যেন মনে হচ্ছে স্বয়ং ভেনাস। স্টেজে আলোর প্রয়োজন নেই, মেয়েটির উপস্থিতিই যথেষ্ট।
কিন্তু সবচেয়ে বেমানান ওর গলায় রবীন্দ্রসংগীতটা।

এরকম একটা মেয়েকে গীটার বাজিয়ে পপ সং এ মানায়।আমার বুকের মধ্যে তুষারপাত অব্যাহত থাকলো। সম্বিৎ ফিরলো একগাদা হাততালির আওয়াজে। গান শেষ। আমার ভেনাস শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে স্টেজ থেকে নেমে এলো।
একি! ও তো আমার দিকেই আসছে, মুখে হাসি। মাসকয়েক আগেই আমরা কলকাতায় এসেছি। আমাকে ওর পক্ষে চেনা তো impossible to the power infinitely. আমাকে পাশ কাটিয়ে ভেনাস আমার মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আমার চশমা ঝাপসা হয়ে গেল কেন? তুষারপাতের কারণে?

মা দেখছি ওর সাথে বেশ হেসে কথা বলছে সঙ্গে আরও একজন মহিলা। আমার সামনে যেন হঠাৎ করেই ৮০ র দশকের কোনও বাংলা সিনেমা চলছে। কিছু কিছু বুঝতে পারছি, তবে বেশীরভাগটাই দুর্বোধ্য। বিস্মিত হওয়াও বুঝি ভুলে গেছি।

এই সবের মধ্যে মায়ের গলার আওয়াজ শুনলাম, আমাকে ডাকছে। সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, মা আমার ভেনাস আর ওই মহিলার ছটা চোখ আমার দিকে। মায়ের সাথে আমার দূরত্ব প্রায় কুড়ি ফুট। ওই দূরত্বটা মনে হয় আমি যেন উড়ে চলে গেলাম। মা ওদের সাথে আমার আলাপ করালো। বুকের মধ্যে এই মুহূর্তে যা তুষারপাত হচ্ছে তাতে করে কলকাতার মানুষ একটা গরমের মরশুম দিব্য ডিসেম্বর মাস ভেবে চালিয়ে দিতে পারে।

আমার ভেনাসের নাম গীতাঞ্জলী। ওহ্ গড এখানেও রবীন্দ্রনাথ। ওর সঙ্গের মহিলাটি ওর পিসি। ওঁনার সাথে আমার মায়ের আগের আলাপ ছিল। আজকের অনুষ্ঠানে এসে নতুন করে আবার দেখা হলো।
গীত (ওকে মনে মনে এখন এই নামেই আমি ডাকছি) প্রেসিডেন্সিতে বাংলা অনার্স পড়ে। ওর দিকে ইচ্ছা থাকলেও আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে পারছিলাম না। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে “প্রাণ চায়, চক্ষু না চায়”, অদ্ভুত ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথ কি আমার মনের কথা বুঝেই এই গানটি লিখেছিলেন?

সেদিন অনুষ্ঠানের শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মায়ের কাছে দু’টো খবর পেলাম। ভালো খবর হলো, গীত আমাদের বাড়ির কাছেই থাকে। আর পরের খবরটা হলো, ওর মা নেই। ওর ওই পিসির কাছেই ও বড় হয়েছে। বাড়িতে গীত, ওর পিসি আর বাবা থাকেন। অচেনা মেয়েটার জন্য আর মনে ভালো লাগার থেকেও মমত্ববোধ গড়ে উঠলো।

মাস কয়েকের মধ্যে গীতদের সাথে আমাদের বাড়ির একটা ভালো সম্পর্ক তৈরী হলো। মাঝে মাঝে গীত আমাদের বাড়ি এসে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতো। আমার বাবা, মাকে দেখতাম, বিভোর হয়ে গান শুনতো।
আমি ওই সময়টা মনে মনে শাকিরার গান ভাঁজতাম। মুখ এমন একটা ভাব করতাম,যেন গীতের গান আমার ভালো লাগছে।
এরমধ্যে একদিনের ঘটনা, দুর্গাপুজোর আগে। আমি পূজোর লেটেস্ট হলিউড হেয়ার স্টাইল করে বেশ কেৎ নিয়ে সেলফি তুলছি, কখন গীত আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। সমরেশদা বলে যখন ডাকলো, তখন ওর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আবারও তুষারপাত কিন্তু এবার যেন একটু বেশী।
গীত যা বললো তার সারমর্ম হলো যে, বিজয়ার পরের দিন আমাদের পাড়ায় রবীন্দ্রনাথের নাটক হবে, সেখানে আমাকে অভিনয় করতে হবে।
আকাশ থেকে পড়লে যত না অবাক হওয়া যায় আমি তার থেকেও অবাক বিস্ময়ে গীতের দিকে তাকালাম। আমার কিছু বলার আগেই মা এসে বললো, “তাহলেই হয়েছে, সোম করবে বাংলা নাটক? কি যে বলিস্? ও একটা পুরো sentence বাংলায় বলতে পারে না।”
আমি বললাম, “তোমরা যে কি বাংলা আর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আদিখ্যেতা কর, ওটা কোনও গান? কত বছর আগে কি সব লিখে গেছে, সেই নিয়ে বাঙালীর বাওয়ালীর শেষ নেই”।
মুহূর্তের মধ্যে গীতের চোখদুটো ব্যথায় ভরে উঠলো। বুঝতে পারলাম, একটু বেশী হয়ে গেছে। আমার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা দৃষ্টিতে গীত বলতে লাগলো, “দেখ সমরেশদা, আমি জানি তুমি এসবের কিছুই বোঝো না। কিন্তু জীবনকে বুঝতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হবে। ওঁর থেকে বড়ো প্রেম আর হয় না। বাংলা পড়তে পারো না, গীতাঞ্জলীর ইংলিশ অনুবাদ গুলো পড়ে দেখো, জীবন দর্শনটাই বদলে যাবে”। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গীত চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম একা। আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। দাড়িওয়ালা রবীন্দ্রনাথের ওপর খুব রাগ হচ্ছিল, কি দরকার ছিল এত কিছু লেখার? উনি না থাকলে আমার লাভস্টোরী দিব্যি উতরে যেতো।

সেবারের দুর্গাপুজোটা কাটিয়েছিলাম গীতাঞ্জলীর ইংলিশ অনুবাদ পড়ে।এমনও দিন গেছে বিছানায় শুয়ে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, মা এসে চশমা খুলে আলো নিভিয়ে দিয়েছে।
মা কিন্তু আমাকে একবারও জিজ্ঞাসা করেনি আমি কেন রবীন্দ্রনাথ পড়ছি বা অবাকও হয়নি। মা বোধহয় আমাকে বুঝেছিল।মায়েরা তো এমনই হয়।

একটা সময়ে শাকিরা, ব্রেটনীরা আমার মোবাইলের সং লিস্ট থেকে বাদ পড়তে লাগলো, সংলিস্ট ভরে উঠতে লাগলো রবীন্দ্রনাথের গানে। এর মাঝে কয়েকবার গীতের সাথে আমার দেখা হয়েছে, আমি ওর সামনে সহজ হতে পারিনি। ওকে বলতে পারিনি যে, আমার জীবনে কি পরিবর্তন ঘটেছে। মনের মধ্যে তুষারপাত হয়েছে, চশমা ঝাপসা হয়নি পরিবর্তে চোখ ঝাপসা হয়েছে।

আজ আবার রবীন্দ্রজয়ন্তী। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি কথায় কথায় ইংলিশ আওড়াতাম, ইউনিভার্সিটিতে ‘কুল স্যাম’ নামে পরিচিত আমি, জিন্স আর টি শার্টে স্বচ্ছন্দ আমি আজ রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পায়জামা পাঞ্জাবী পড়ে এসেছি। আমার নাম মাইকে এনাউন্স হলো “সমরেশ দত্ত আজ রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আবৃত্তি করবেন”।
আমি স্টেজে উঠলাম, প্রথমবার নিজেকে অবাক কটে দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করলাম, হ্যাঁ পুরো শুদ্ধ বাংলায়।
“তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি, শত রূপে শতবার জনমে জনমে।”

কবিতাটা আবৃত্তি করতে করতে আবেগে চোখে জল এসে গিয়েছিল।মনের মধ্যে একটা তীব্র ভালোলাগা অনুভব করছিলাম।ভালোবাসা কতটা থাকলে মানুষ এমন করে লিখতে পারে? এতো শুধু প্রেমের কবিতা নয়, ঈশ্বরের কাছে শ্রদ্ধাবনত নৈবেদ্যর নিবেদনও বটে।
ভালোবাসা কতটা সুন্দর কতটা হৃদয়স্পর্শী সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম।কবিতার শেষে হলভর্তি শ্রোতার বিপুল করধ্বনি বুঝিয়ে দিচ্ছিল আমি সফল। স্টেজ থেকে নামতে নামতে দেখলাম গীত হাসি হাসি মুখে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। পলকে রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে চোখ গেল, যেন মনে হলো মিটিমিটি হাসছেন আমার দিকে তাকিয়ে আর বলছেন, “কি? এতটা করে দিলাম, বাকিটা পারবে না”?
আমি ওঁনার কবিতার শেষ লাইন দুটো মনের মধ্যে অনুভব করলাম,

“নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ, নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে, সকল প্রেমের স্মৃতি-
সকল কালের সকল কবির গীতি”।

ঋণস্বীকার :- তুষারপাতের ব্যাপারটা স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর মোমকাগজ উপন্যাস থেকে নেওয়া।


ekti premer golpo o rabindranath
Facebook Comments

You Might Also Like