ছোটগল্প সাহিত্য

ডিসেম্বর – অভিরূপ সিদ্ধান্ত

ছরভর বসের ক্যাঁচক্যাঁচানি মন্ত্র, উইকএন্ড এ মাঝরাত অবধি পার্টি তাও ঐ দু-একবার মাসে, অফিস ফেরত মাঝে মাঝে চায়ের দোকানে আড্ডা, কখনও বা শপিং মলে গিয়ে নিজের একটা টি-শার্ট কেনা আর কিছু সরস বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নেওয়া ছাড়া নতুন কিছু করা হয়ে ওঠেনা তার। হাজার রেজোলিউশানের শেষটা এভাবেই শেষ কয়েক বছর শেষ হয় অনিমেষের। তবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি একটা চনমনে অনিমেষকে আবিষ্কার করে সে, যখন তার ‘ঈশা’ তাকে শহরে আসবার খবর দেয়। প্রতি বছরই ছুটি নিয়ে ব্যাঙ্গালোর থেকে ফেরে এই সময়।

december abhirup siddhanta
এই কয়েকটা দিন বেশ অন্যরকম কাটে অনিমেষের, ঈশার ছেলেমানুষি, হাজার একশো বায়না এসব পূরণ করতে করতে কখন যে কয়েকটা দিন ফুরিয়ে যায় তা আর বোঝাই যায়না। আর এবারে তার শেষ বায়না ফেরার দিন সকাল থেকেই তার অনিকে চাই। সেই যে ইচ্ছে…

december abhirup siddhanta
তবে শেষের এই দিনটাকে অনিও বেশ স্মরণীয় করে রাখতে চায়। একটা হিরো হিরো স্বত্ত্বা তাকে পেয়ে বসে ঐদিন। নিজের ঐ পেটুক পেটের স্থূলত্বটা ঐ একদিনই মাপতে ইচ্ছে হয় তার। ঐ একটা দিন আয়নাও তার প্রেমে পড়ে যায়, কখনও তার দিকে এতো গভীর ভাবে তাকায়নি তো অনিমেষ। অবশেষে বেরিয়ে পড়ে সে।

december abhirup siddhanta
সারাদিন শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ঘুরে ঈশার শেষ ইচ্ছের দিকে পা মেলায় সে। আর প্রতি বারের মত তার ‘মিলন মেলা’র সঙ্গী আমায় হতেই হবে। দুঃখ শুধু একটাই এবারের এই সন্ধ্যেটা, এবছরের মত তাদের মিলিত হবার শেষ সন্ধ্যে। তবে এই মেলার দু’একটা বৈশিষ্ট্য না বললেই নয়, যা সে এই কয়েক বছর এসে উপলব্ধি করেছে। প্রথমত, এই মেলা খ্যাতনামা ও সম্ভাবনাময় বহু শিল্পীকে একমঞ্চে একসঙ্গে সুর প্রকাশের অধিকার দেয়, যা বেশ অনন্য। আর সুরের সাথে ঈশার এক চিরন্তন ভালবাসা। আর দ্বিতীয় কারণটা হল, ভগবানের সাথে মানব আত্মার কোথাও যেন মিলন ঘটে এই মেলায়, যখন বিশাল রাধা-কৃষ্ণের পূজোর আয়োজন করেন উদ্যোক্তরা। মিলন মেলা নামটা যেন তখন, কোথাও স্বার্থক হয়ে ওঠে।

december abhirup siddhanta
অবশেষে যখন প্রবেশ ঘটল, তখন সন্ধ্যে ছুঁইছুঁই। ঘুরতে ঘুরতে কখন যে ডি.এস.এল.আর নিয়ে দৃশ্যবন্দীর খেলায় ঈশা মেতে উঠেছিল, তা বোধগম্য হয়ে ওঠেনি অনির। এসব দৃশ্য তার তখনই বোধগম্য হবে, যখন সে তার এ বছরের শেষ দেখার, শেষ সফরে অংশগ্রহণ করবে। গানের সুরে আর ওর ছন্দে পা মেলাতে মেলাতে কখন যে ৮টা বেজে গিয়েছিল মনে নেই, ওর আঙ্গুল যখন তার হাত স্পর্শ করে, তখন আবার তা ছাড়ার ঘন্টাটাও বাজিয়ে দেয় যেন, সে এক অদ্ভূত অনুভূতি অনিমেষ অনুভব করে প্রতিটা বছর। এয়ারপোর্ট যাওয়ার ক্যাব ধরে ওরা, শেষ কিছু ভালবাসার মুহূর্ত একসঙ্গে ভাগ করতে থাকে, ক্যামেরা বন্দী দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ থমকে যায় অনিমেষ। সে বুঝে উঠতে পারেনা এটা ওর ইচ্ছাকৃত দৃশ্যবন্দী না অনিচ্ছাকৃত। নিজের কাছে কোথাও লজ্জিত হয় সে।

december abhirup siddhanta
না, শেষ সফরে আর কোনও কথা বলেনি অনিমেষ। মন খারাপের ভিড়ে মাঝেমাঝে স্তব্ধ হয় অনিমেষ, তবে শেষ সাক্ষাতে তা সে বুঝতে দেয়না কখনও। হঠাৎ এই নীরবতার কারণ খুঁজতে ঈশাও যেন নীরব হয়ে গেছিল সেদিন। এয়ারপোর্টে শেষ মুহূর্তে একটা শেষ চুম্বন আর ভালোটি থাকিস দিয়ে তাকে বিদায় যানায় অনি।
রানওয়ে দিয়ে দৌড় দেয় বিমান। ক্যাবে উঠেই চোখটা বন্ধ করে অনি। ক্যমেরাবন্দী দৃশ্যগুলো বারবার ভেসে আসতে থাকে,
“হাজার নাস্তিক অনিমেষ সেদিন ধন্যবাদ দেয় ভগবান কে। যে শিশুটাকে ফিরিয়ে দিতে সে ভাবেনি একবারও, সেই ক্ষুদার্তেরই ক্ষুধা মেটায় ভগবান।

december abhirup siddhanta
ভগবানের আশীর্বাদ পেতে তার মত মানুষ যখন প্রেমিকের ইচ্ছেতে ভোগের অন্ন পাওয়ার লাইনে দাঁড়ায়, সে কী কখনও ভেবেছে তার পশ্চাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটা তার ক্ষুধার লালসা মেটাতে ঐ এক ই সারিতে তখন, যাকে সে ফিরিয়েছিল একটু আগেই!!
বাড়ির একটু আগেই নেমে পড়ে সে, একটা লম্বা সিগারেটে টান দিতে দিতে রাতের ফাঁকা রাস্তার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার পথে ফোনটা বেজে ওঠে তার……

december abhirup siddhanta
“আমি জানতাম না আমার দৃশ্যগুলো তোকে এত কষ্ট দেবে, পৌঁছে গেছি জানিস, দেখ ভগবান তো সবার, এক মানুষ তো এক জীবনে সবার ফ্যারিস্তা হতে পারে না, তবে হ্যাঁ, আমরা না হয় কিছু মানুষের কাছে সান্তাক্লজ হতেই পারি, কী বলিস!
কিছু বলার আগেই ও প্রান্ত থেকে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে ঈশা। ফোনটা কেটে মুচকি হেসে ওঠে অনি,নিজের ভালবাসাকে আলিঙ্গনের তীব্র ইচ্ছাকে দমিয়ে রেখে ফিস ফিসিয়ে বলে ওঠে, “এ তো আমার নয়, আমাদের রেজোলিউশান ।কথা দিলাম পূর্ণ হবেই’।

december abhirup siddhanta
““খ্রীষ্টমাসের উৎসব কি শুধুই তাদের যাদের পার্কস্ট্রীটের ঝলমলে আলোয় গা ভাসানোর দক্ষতা রয়েছে! কিছুমানুষের কাছে বর্ষবরণ বোধহয় নেই। রাতের আকাশে আমাদের ওড়ানো আতসবাজি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে ওরা, এ সমাজে ওদেরই আনন্দরা বোধহয় অন্যের আনন্দে হাসতে পারে। পরের সকালে তো আবার, ওদের আগের সকালেই ফিরতে হবে। আরও কীছু আতসবাজির রাত দেখার স্বপ্নতো ওরাও দেখে। আমরা কি পারিনা ওদের স্বপ্নের পাশে থাকতে!!!!”” -ঘুমোতে যাওয়ার আগে সেদিন আর ডায়েরী লেখেনি অনি। মনের কথাগুলো সেদিন লিখে ফেলেছিল ফেবুর পাতায়, না কোনো সহানূভূতি পূর্ণ মন্তব্য বা বেশ কিছু হৃদয় বা ভাললাগার চিহ্ন গায়ে মাখতে না, লিখে ফেলেছিল তার সেদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে, যে যন্ত্রণা বড্ড সামাজিক।


december abhirup siddhanta
Facebook Comments

You Might Also Like