ছোটগল্প সাহিত্য

বসন্তের অন্তিম নিঃশ্বাসে – শোভন সেনগুপ্ত

‘ফুটন্ত গরমে রঙিন হল বসন্ত ♥’

তাব্দী আর স্পর্শক – দু’জনের হোয়াটস্‌অ্যাপ স্ট্যাটাসে একই লেখা দেখে খানিক স্তম্ভিত হল পায়েল। সেই প্রাইমারি স্কুলে পড়া থেকে শতাব্দী আর পায়েল বন্ধু। বেঞ্চে পাশাপাশি বসার জায়গা না পেলে একরাশ ক্লাসমেটদের সামনে কান্না জুড়ে দিত পায়েল। কখনও সখনও কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হয়ে গেলে দুই বাড়ির কাকিমা-পিসিমাদের পিএনপিসি-তে এখনও সেই কান্না চর্চার বিষয় – সে গল্প শুরু হলেই শতাব্দী ছুট্টে সেখান থেকে পালিয়ে যেত। প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত, তারপর বিরক্তি। পায়েল একটু চাপা স্বভাবের। অত দৌড়াদৌড়ি করত না ছেলেবেলায় রাগ হলে ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ নিচু করে তীক্ষ্ণ নিশানায় তাকিয়ে থাকত আর চোখ পিটপিট করত। এখন কানে হেডফোন গুঁজে রাখে। জানি না গান শোনে না কি অন্য কিছু !

স্কুলে ট্যুয়েলভের শেষদিনে শতাব্দী কোত্থেকে একটা চিঠি এনে গুঁজে দিল পায়েলের হাতে। এদিক সেদিক না তাকিয়ে কাগজের ভাঁজ খুলতে যাবে অমনি স্পর্শক এসে কেড়ে নিল চিঠিটা। -“শতাব্দী, চিঠিটা আমি তোকে দিলাম, আর তুই ওকে পড়াতে নিয়ে এলি ?”

“তাতে কি? আমি তো পায়েলকে সবকিছু বলি”।

“সবকিছু বলিস”?

“হুম্‌”, স্বভাবসিদ্ধ মিষ্টি গলায় টেনে টেনে কথাটা বলল শতাব্দী।

-“তাহলে আর চিঠি দেখিয়ে কাজ নেই। চিঠির কথা সরাসরিই বলি”।

এদিকে কি যে হয়ে চলেছে ! পায়েল একবার শুধু এর মুখ আর তার মুখে চেয়ে আছে। হঠাৎ স্পর্শক দু’হাত দিয়ে পায়েলের কাঁধটা একটু ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, “দেখ পায়েল, ক্লাস ইলেভেন থেকে তুই আমাকে চিনিস, আমি তোকে। তুই ভালো করেই জানিস যে আমার তোকে ভাল লাগে। আগে মেসেজে, এফবিতে কথা বলতিস, হোয়াটস্‌অ্যাপেও রিপ্লাই দিতিস। সেদিন এ.বি’র ইংলিশ ব্যাচে তোকে নোটের খাতা ফেরত দেওয়ার সময় খাতার ভেতর ভরে একটা চিরকুট দিয়েছিলাম তোকে। আমি জানি, তুই সেটা পেয়েছিলি। তারপর কতদিন দেখি তুই অনলাইন, ভুল করেও কি একটা রিপ্লাই আসতে নেই”? একটানা বলে গেল স্পর্শক।

আজও সেইদিনটার কথা মনে করে মাঝেমাঝেই খাতার ভাঁজ থেকে বের করে চিরকুটের ওপর হাত বোলায় পায়েল। বোধ হয় একটা দ্বিধা কাজ করে ওর মনে। মনের না বলা কিছু কথা জীবনভর অতৃপ্তির দহনে মনকে তিষ্ঠতে দেয় না। পায়েল জানে সেটা। তবু ও সেদিন কোনো উত্তর না দিয়েই বাড়ি চলে এসেছিল। বলা হয় নি স্পর্শককে ওর মনের কথা। তার-ও যে ভালো লাগে স্পর্শককে। প্রতিটা মুহূর্তে পায়েলের নিষ্পাপ মনটাকে ছুঁয়ে যায় স্পর্শক। স্পর্শকও জানতে পারে না সে কথা। কেউ না।

সেদিন থেকে শতাব্দীও পায়েলের থেকে কেমন যেন দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়। দূরত্ব আরও বাড়ে যখন বাড়ি ছেড়ে যাবে না বলে পায়েল ভর্তি হয় ইগনুতে আর রবীন্দ্রভারতীতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে কলকাতা চলে আসে শতাব্দী। স্পর্শকও বর্ধমান থেকে এসে বি.টেকে ভর্তি হয়ে যায় যাদবপুরে।

আজ আটমাস বাদে আবার সব বন্ধুরা একসাথে এসেছিল পায়েলের বাড়িতে। গতমাস থেকে পায়েলের কেমোথেরাপি শুরু হয়েছে। পায়েল আশা করেছিল শতাব্দী অন্তত আসবে খবরটা জানতে পেরে। চৈত্র মাসের শেষ রাতে হোয়াটস্‌অ্যাপে স্পর্শকের ডিপি-তে শতাব্দীর সাথে স্পর্শকের সেলফি ছুঁয়ে দেখতে দেখতে পায়েলের চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।


কলেজ হোক বা ইউনিভার্সিটি-অফিস, সরস্বতী পুজোয় সেই স্কুলেই যাই ফিরে ফিরে বার বার। আর তারপর ?
পড়ুন ‘আবদার’ – লিখেছেন শোভন সেনগুপ্ত  
>>

bosonter-ontim-nishwase-sovan-sengupta
Facebook Comments

You Might Also Like