মুক্তগদ্য সাহিত্য

মুঠোফোনে বন্দী প্রাণ – বিপুল দাস

রণে বনে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব। মনেপ্রাণে সবাই কথাটাকে গ্রহণ করতে পেরেছিল বলে মনে হয়না। যদি পারতো তবে লোকনাথের ভক্ত সংখ্যা গিনেস বুকে নাম লেখাতো। লোকনাথ যা পারেন নি তা ছোট্ট ইলেকট্রনিক গ্যাজেট করে দেখিয়েছে এ যুগে, তাও মূলত লোকনাথ সীমাবদ্ধ দেশের গণ্ডীতে, আর এই ছোট্ট গ্যাজেটের সীমাবদ্ধতা খুঁজতে যাওয়াই নিজের সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। কোথায় নেই যন্ত্রটা, সর্বত্র বিরাজমান। বিপদে স্মরণ করার দরকার নেই, আনন্দের সাথে বিরাজ করে সবার সাথে, সবার কাছে, বুকে, হাতে, কানে, ব্যাগে, ট্রেনে বাসে, জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্র। মনের আনন্দে সোয়াইপ্‌ করো আর পৌঁছে যাও নিমেষে। আশেপাশে তাকাবার দরকার নেই, খেলা, রাজনীতি, সঙ্গীত, সিনেমা যেখানেই চাও পৌঁছে যাও। চোখ দিয়ে দেখ আর পাস্‌ করে দাও সাথেসাথে। কি দেখলে বোঝানোর জন্য একটা লাইকই যথেষ্ট। মস্তিষ্ক খাটানোর বেশী দরকার নেই। আর দরকারই বা কি? মাথা খাটালেই নেশা কেটে যাবে। মদ কি কেউ মদের কেমিস্ট্রি বুঝে খায়? খেলে নেশা হয়, এটাই এনাফ। নেশার কার্যকারণ জানার দরকার নেই। এও এক অমোঘ নেশা, হাতে এলেই নেশার শুরু। শিক্ষিত, অশিক্ষিত সবাই জব্দ এর হাতে। নেশায় শিক্ষিত, অশিক্ষিত হয় না। সকালের পটি ক্লিয়ার সাথে যন্ত্রটা থাকলে, কায়মচূর্ণ শিশু। রাস্তায় সিগনাল, কুছ পরোয়া নেহি, প্রাণের থেকেও প্রিয় মেহবুবা হাতে, এই মুহূর্তের খবর এক্ষুনি পাস্‌ করতে হবে, বাই চান্স কেউ যদি আগে মেসেজ করে ফেলে নিজেকে তখন পিছিয়ে পড়া জনজাতির প্রতিনধি বলে মনে করা হবে। অতএব এগিয়ে চল বন্ধু। সময় নষ্ট করা যাবে না এক মুহূর্তও। এগিয়ে চলাটাই বড় কথা, কোথায়, কেন, ভাবার দরকার নেই। মূলমন্ত্র ‘সেন্ড আ হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ’। দেখ, আবার পাস্‌ করো, বোঝার চেষ্টা কোরো না। ছেড়ে দাও সীমার মাঝে অসীমে, খবরটা আলোড়ন ফেলে দেবে, মরতে হতে পারে কাউকে, আগুন লাগতে পারে, জাতিদাঙ্গা হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, যাই হোক না কেন আল্টিমেটলি আবার মেসেজ, আবার জনপ্রিয় আনন্দ বাক্সে সান্ধ্যকালীন চায়ের পেয়ালায় তুফান। বিতর্কের ঝড়। গণতান্ত্রিক দেশ তো… গণতন্ত্রে অধিকার সবার, কর্তব্যে নয়।

সমগ্র জগৎ ভেসে চলেছে মোবাইলে চেপে, বাইল মানে আক্ষরিক অর্থে পিত্ত, শরীরে থাকাটা জরুরী, কিন্তু ছড়িয়ে পড়লেই দেহে সমস্যা। মোবাইলের ব্যবহারও তাই, সীমিত উপযুক্ত ব্যবহার আবশ্যক। কম হলে দ্রুততার সাথে আধুনিক যোগাযোগ হতে বিচ্ছিন্ন, আবার অধিক হলে মূর্তিমান রোবট। চোখ আছে কিন্তু চোখের ভাষা নেই। সবাই তুচ্ছ। কেবল আমি আর আমার মোবাইল। পাশে কিছু দেখে ফেলতে হয়, ঘাড় তাই গোঁজা, দেখলেই অনুভূতি সজাগ হয়ে উঠবে যেন। আর অনুভূতি জাগলেই জাগবে সহানুভূতি।

আজব অবস্থা। সময়ের সাথে তাল মেলাতে এরকম দিন আসবে না তো, যখন ডাক্তার লিখবে আইসিইউ-র প্রেসক্রিপশনে ওষুধের সাথে অমুক কোম্পানির তমুক মোবাইল। কানে তার গুঁজে রোগী ভেন্টিলেটরে। মোবাইলে মিলবে কি প্রাণের সাড়া? প্রকৃতির সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি প্রাণ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে যখন মোবাইলই শেষ কথা। অনুভূতি, ভালোবাসা, স্নেহ সবই মুঠোফোনে মিলেমিশে একাকার।

Facebook Comments

You Might Also Like