ছোটগল্প সাহিত্য

হিরো – পৃথা গাঙ্গুলী

সিরিজঃ সাইকেল
সম্পাদনাঃ শোভন সেনগুপ্ত

ওওওওওরে, আরে ওরে ওরে ওরে, একটু আস্তে ফেল বাপ একটু আস্তে ফেল কোমর টোমড় সব ভাঙ্গিয়া যাবে রে, ওরে বাবারে, ওফফ। সাইকেল বলে কি যা খুশী করা যায় নাকি? যখন তখন ঘুম থেকে তুলে দেয়, কখনও রোদের মধ্যে দাড় করিয়ে রাখে তো কখন বৃষ্টিতে ভেজায়, আমার কি কষ্ট হয় না নাকি! এই এই এইতো সেদিন, কথা নেই বার্তা নেই দিল ধমাস করে ফেলে, কাকা না দাদা কে এসেছে শুনেই দিল ঘরের ভেতর ছুট আর আমি মরলাম কি বাঁচলাম একবারও দেখল না বটে, আমিও তক্কে তক্কে ছিলাম যেই না আবার বেরোতে যাবে ওমনি দিলাম চেনটা ফেলে, ব্যাস আর যায় কোথায় আমায় নিয়ে টানাটানি, যা মজা হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল এক্কেবারে সাত জন্মের রাগ তুলেছি।

ওওওহো এই দেখ, আমি তো আমার পরিচয় টাই দিইনি। আমি হলাম গিয়ে একটি সাইকেল, যা তা নই এক্কেবারে হিরো। যদিও আমায় আদর করে ছোটাযান বলে আমার আরোহী, সেই সকাল থেকে আমায় নিয়ে ছোটে, ব্যাটার ছেলে বোধহয় কলেজে পড়ে, রোজ সকালে ঘটাং করে তুলবে কি সব লম্বা লম্বা লাঠির মতোন জিনিস আমার হাতে ঝোলাবে আর ছুটবে, মাঝে মাঝে কান ধরে টেনে ধরে আর আমিও চেঁচাই কিরিং কিরিং করে। এই হল গিয়া আমার জীবন, খুব কষ্ট জানেন, খুব কষ্ট কেউ বোঝে না, সাইকেল বলিয়া কেউ গ্রাহ্যই করে না। এভাবেই আমার জীবন চলে সোজা সাপ্টা সাদামাঠা। মাঝে মাঝে মনে হয় দিই ছুট, কিন্তু পরে আবার ভাবি বেশ তো আছি, সকালের ফুরফুরে হাওয়া খেতে খেতে বেরোই, তারপর খোকা বাবু আমায় আমার বন্ধুদের কাছে রেখে চলে যায়, মাঝে মাঝে আবার একজন খুকুমণিও ওঠে আমার ওপর বসে আমার কিন্তু মন্দ লাগে বরং ভালোই লাগে, তাই সব মিলিয়ে আমার বেশ ভালোই কাটে।

বেশ কিছুদিন পরেঃ

আরে, আবার এই ভর দুপুরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে, আমায় আবার সকাল সকাল স্নান করালো, কে জানে বাবা কি ফন্দি খুঁজছে, এ যে দেখছি সকাল দুপুর বিকেল কোনো সময়ই কোনো শান্তি নেই, আজ আবার এরকম ঘোড়ার মতোন ছোটে ক্যান? আর এ আবার কোন রাস্তায় নিয়ে যায়! উফফফ জ্বালিয়ে মারল, আরে ভগবান আমায় একটু ছুটি দ্যান তো

কিছুক্ষণ পরঃ

আরেএএএ ব্যাস, এ কোথায় আনল ভায়া, কি সুন্দর জায়গা, কতো গাছ, ফুল, পাখি, কি মিষ্টি জায়গা, নাহহহ বাছা আমার বড়ো ভাল আমায় ঘুরতে নিয়ে যাবে বলে এতো। তোড়জো, আহহ বেশ বেশ, আরে এ যে দাড় করিয়ে দেয়, ওমা, এ যে দেখছি খুকুমণিটা দাড়িয়ে আছে, আচ্ছা আচ্ছা বুঝলুম, এর লগে এত্তো জোড়ে ছুর্টিয়াছিল, হায় পোড়া কপাল আর আমি ভাবি কিনা আমায় নিয়ে ঘুর্ইতে নিয়ে যাইছে। তা পোলাপানেরা কি কথা কয়, শুনিতো

“দেখ অর্ণব, তোকে অনেকবার বলেছি এই দাদুর আমলের সাইকেল টা নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসবি না। তোকে আজ পরিষ্কার বলে দিলাম হয় তুই এই সাইকেলটা ফেলবি নয়তো আমায় ছাড়বি। যত্তো সব ওল্ড ভারসন”

কিছুমাস পরঃ

আরেএএএ বাপরে আস্তে আস্তে উফ, ও হরি, আমায় এভাবে ফেললো কে? আর আমার সাথে এতো সব জিনিসপত্র কেনো,? এ সবইতো খোকাবাবুদের মনে হচ্ছে, আর এটা কোথায় তুললো আমায়, এ তো গাড়ী মনে হচ্ছে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছি আমরা? আমায় তো মাসের পর মাস আর নেয়নি ব্যাটা, ফেলে রেখেছিল এক কোণায়, তাহলে আজ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! আরে এ কোন জায়গা? কত্তো গাড়ী, আমার মতোন ও অনেকে আছে দেখছি, কতো, বড় বড় বাড়ী, লোকজন কত্তো সব, এ কি সেই গল্পে শোনা বড় শহরটা নাকি! কি যেন নাম, কি যেনো নাম উমমম, ওওও মনে পড়েছে এতো কলকাত, তো দাদাবাবুরা সব এখানে এলেন নাকি! বাহ বেশ ভালো, এবার আমি কলকাতা ঘুরব, উফফ।

কিছুক্ষণ পরঃ

ওমা, এ কোথায় এলাম, কত্তো বড় বাড়ী, বাবা, এই তো আমাকেও নামালো, আমি এখানে কোথায় থাকব! ওপরে! এখানে তো দালান নেই, নিশ্চয় তাই, ওই ওই ওইতো খোকাবাবু আসছে, একি একি আমায় ও কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সব জিনিসই তো ওপরে উঠল তাহলে আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! এতো একটা ঘরের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, আরে কি অন্ধকার, আমায় এখানে রাখছে কেনো, ও খোকাবাবু আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস? আমায় ফেলে যাস না, আ আ আ আমি আর রাগ করবো না, তুই যতো খুশী আমায় চালা, আমি তো ওইসব মজা করে বলতাম, সত্যি ছিল নাকি রে, এভাবে আমায় একা করে যাস না রে খোকা, তুই বল আমি সেই কোন যুগ থেকে আছি, তোর দাদু প্রথম আনে আমায়, তোদের কতো সুখ দুঃখের সাথী বলতো, আজ তুই সব ভুলে যাবি খোকা? নতুন যান পেয়েছিস বলে আমায় আজ পর করে দিলি? কিরে এএএ চলে যাচ্ছিস, যাস না যাস না।

চলে গেলি! ও, বুঝলাম, ঘোড়া এখন বুড়ো হয়েছে, বুড়ো ঘোড়ার কোনো।দাম নাই কোনো দাম নাই, এভাবে না রেখে তো বেচে দিতে পারতিস, আমি নয় ওই হরি-র দোকানেই থাকতাম, যেখান থেকে এসেছিলাম সেখানেই নয় যেতাম।

বেশ! আজ থেকে আমি এই রণে ভঙ্গ দিলাম। আমায় আর তুই কখনো চালাতেই পারবি না। এ আমি পণ নিলাম।

বেশ কিছুদিন পরেঃ

গ্যারেজ ঘরে খোকার প্রবেশ, খোকা হাত বোলায় তার প্রিয় ছোটাযানকে ধুলো ঝাড়ে, বেলটায় হাত দেয় কিন্তু বেল আর বাজে না, চেন টাও পড়া, গায়ের মধ্যে এ-কদিনেই যেনো মরচে পড়ে গেছে, কিন্তু আমি তো জলে রাখিনি, তাহলে!

“ওরে ওটা তোর মনে পড়েছে রে, মরছে টা,

বাবা তুমি? হ্যাঁ আমি,

দেখো খোকা আজ আমি তোমায় কিছু কথা বলতে চাই, তুমি নতুন চাকরী পেলে, কলকাতায় এলে, নতুনের আগমনে পুরনোদের দিলে ছুটি। তাঃ ভালোঃ আর, তাছাড়া  এখন তুমি বাড়ীর সামনে অফিসের গাড়ী পাবে আর পাঁচজনের মতোন তো তাতেই যাবে,  আর এখন তো তোমার হিরো তোমার কাছে অচল তাই। এগুলো তো স্বাভাবিক ঘটনা, আর এ সব ঘটনাই তোমার জানা। এবার আমি তোমাকে কত গুলো গল্প বলব যা তোমার জানা নয়, কিন্তু তুমি কি এখন তা শুনতে প্রস্তুত?

হ্যাঁ আমি প্রস্তুতঃ

তুমি যেদিন প্রথম কলেজে ভরতি হতে গেলে তখন তুমি আমায় বলেছিলে একটা সাইকেল কিনে দিতে হবে, তখন আমার তোমাকে নতুন সাইকেল কিংবা কিছু কিনে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু তোমার দাদু বলেছিল সাইকেলটা তোমায় দিতে আর তখন আমি পুরোদমে দৌড়াচ্ছি ওই সাইকেল নিয়ে, ওটা ছাড়া আমি অচল ছিলাম। কিন্তু ওটা আমি তোমায় দিয়েছিলাম তোমার যাতে কোনো পড়াশোনায় খামতি না হয়, আর তার মর্যাদা তুৃমি রেখেচো, আর তুমি তোমার মতোন এখন সাজিয়ে গুছিয়ে নাও, হিরো কে তোমার এখন লাগছে না ওটা আমায় দিয়ে দাও, ওটা আমি অন্য জায়গায় রাখব।

চল চল এই অন্ধকার ঘরে আর বেশীক্ষণ থেকো না। চল, আস্তে আস্তে বেরোয় বেরোয়।

খোকাঃ বাবা আমি একটু হিরো কে দেখব, আমি পরে যাচ্ছি।

বাবাঃ (আলতো হেঁসে) আয়, তাড়াতাড়ি আমি গেট-টা খোলা রাখলাম।

খোকাঃ হিরো আই অ্যাম সরি, জানি না তুই এইসব বুঝিস কিনা, তবে একটা কথা সত্যি আমি আর তোকে ছাড়ছি না, প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে তোকে নিয়ে ঘুরব। আর এখন চল এক পাক মেরে আসি, কলকাতা দেখবি না আমার ছোটোযান।

সাইকেলঃ আপনাদের বলেছিলাম না একটুও শান্তি দেবে না। নাহ এবার ভাবছি আমিও আমার পণ তুলে নিই, সত্যি বলতে। কি ছোটোবাবুর সাথে কলকাতা ঘুরতে যাওয়ার আর তর সইছে না যে

এখন হিরো আর খোকা কলকাতার রাস্তায় ঘুরছে আর নতুন নতুন খুকুমণি খুঁজছে…

আরও পড়ুন >> পাঠকের নোটবুকঃ অমৃতফল

Facebook Comments

You Might Also Like