মুক্তগদ্য সাহিত্য

বিশ্বাসদা শুনতে পাচ্ছেন – বিপুল দাস

বাজার ফেরত হারু দা কে পেলাম মুদি দোকানের সামনে দেখা হল অনেক দিন পর হারুদার সাথে। জিজ্ঞাসা করলাম হারুদার খবর কি? আর খবর! তোরও যা আমারও তাই সবারই তো একই অবস্থা। ঘরে বসে বসে খাচ্ছি ঘুমাচ্ছি আর টেলিভিশনে ই-ক্লাসগুলোতে অ্যাটেন্ড করছি। সেকি? তুমি তো বেশ কিছুদিন হল রিটায়ার করেছ বিজি প্রেস থেকে। তা একজন রিটায়ার্ড পার্সনের এই বয়সে ক্লাস! আরে ভাই এ সে ভৌতবিজ্ঞান ইতিহাস সংস্কৃত বাংলা ক্লাস নয়। বিশ্বাসের ক্লাস। বিশ্বাস? মানে রাইস, মাইস এসব গ্রুপের কোনো নাম কি বিশ্বাস? কথা বলার সাথে সাথে হারুদা মুখটা খানিক বিকৃত করে বলল, তোকে তো ভেঙে বোঝালে আমার নিজের ব্র্যান্ডটার কোনো মূল্যই বাঁচে না আর।

কি হল ব্যাপারটা? বললাম আমি। আরে দেখছিস না ক্রমাগত সমাজের বিভিন্ন সেক্টর থেকে এসে সুধীজনেরা আমাদের বোঝাবার চেষ্টা করছে এখন ঘরে বসে বসে কি করতে হবে; সাবান, জলে, অ্যালকোহল স্যরি স্যরি স্যানিটাইজার কতটা কতক্ষণ কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। এ কথা সে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে এমন সময় বাবলা সাইকেল থেকে নেমে পাশে এসে দাঁড়ালো। তুলনায় অল্প বয়স, রাজনীতির ছেলে, বলল, কি গো থালা বাজিয়েছিলে? হারুদা বলার আগেই আমি আমতা আমতা করে হ্যাঁ বলে ফেললাম। আর বলেই ভাবতে থাকলাম থালা বাজানোর কথায় সরাসরি হ্যাঁ বলাটা কি ঠিক হল? পাশ থেকে হারুদা বলল, মুখ্যমন্ত্রী তো বলেছে ইচ্ছা করলে বাজাও। শোন্‌ বাবলা, বারোটা তো বেজেই গেছে, ক্ষতি কি থালা বাজালে? বাবলা সাইকেলে উঠে পড়ল। বলতে থাকলো, দেখো প্রদীপ জ্বালিয়ে থালা বাজিয়ে যদি মুক্তি মেলে ভাইরাস থেকে। দু-চার কথা মাস্কের মধ্যে থেকে বলতে বলতে হারুদা আগেই ঢুকে পড়ল বাড়িতে।

অধম হাঁটছি আর ভাবছি থালা বাজানো প্রদীপ জ্বালানো সবই তো বিশ্বাসে। সমাজের একদম উচ্চস্থানের নির্দেশ পালন করছি। এর সাথে ভাইরাস মুক্তির কি কোন সম্বন্ধ আছে? আসলে মুক্তি মিলুক আর না মিলুক, বলেছে তাই মেনেছি। এ তো যে সে লোকের কথা নয়। কিন্তু এও তো ঠিক সবাই একজায়গায় নেমে থালা বাজিয়ে বেরানোর সময় কন্টামিনেশন তো এড়ানো যায় নি। সেটাও তো এই মুহূর্তে ঠিক নয়। কি জানি কি যে করব! কেনই বা করব! জানে একমাত্র সর্বশক্তিমান, অবশ্য সেও তো কোয়ারেন্টাইনে। সারাদিন সাধারণের টেলিভিশন ছাড়া আর তো উপদেশ মেলার জায়গা নেই। কিন্তু সমস্যা সেখানেই তো পরস্পর বিরোধী বক্তব্য চ্যানেলগুলি দিবারাত্র সময় কাটাচ্ছে। আর বিশ্বাসটা চির খাচ্ছে তখনই। বিশ্বাস করে ঠকা ভালো। কিন্তু এতো জীবনের ব্যাপার, জুয়া, লটারি বা শেয়ারের টাকা লাগানোর মত ফাটকা ব্যাপার নয়। আর যদি একবার ভুল হয় ব্যাস্‌ হয়ে গেল। পাড়া সমাজ সবাই বাতিল করে দেবে পুরো পরিবারকে। অনেকটা এক ঘরে করে দেবার মত। আবার এও ভাবলাম কত লোকেরাই তো মাঠে ঘাটে বসে দিব্যি গল্প করছে। মুখে মাক্স অনেকেরই নেই। ওরা তো নিজেদের যুক্তিতে সাজিয়ে নিয়েছে নিজেদেরকে। দেখছি না তো আপাতত কোনো অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ পাড়া কিংবা আশেপাশে। তবে উপদেশ কি কিছু ফাঁকি থাকছে। আর এই দোলচাল হয়তো আমার মতোই বেশিরভাগের মনে। কেবল ভাবটা শেয়ার করা যাচ্ছে না। মাক্স মুখ বন্ধ করে রেখেছে।

পড়শী জনবহুল রাষ্ট্র বলছে আমরা করোনা মুক্ত। তখন আবার একদল বলছে ফেক খবর। স্যাটেলাইটে সব সত্যি বন্দি আছে। এর মাঝে ভ্যাকসিন তৈরির সংবাদ আশা জাগাচ্ছে। তখনই কেউ বলছে এসব ভ্যাকসিন ট্যাকসিন কিচ্ছু হবে না দাদা। এটা প্রকৃতি থেকে এসেছে। সেই প্রকৃতি ইমিউনিটি তৈরি করে দেবে। কমিউনাল রায়ট-এর মতো কমিউনিটি কন্টামিনেশন চাই। যত ছড়াবে ইমিউনিটি পাওয়ার বেটার করবে। সাথে আদা, গোলমরিচ, গরম জল তো আছেই। কে বলল গরম জল? আরে ৭০ থেকে ৮০ ডিগ্রী তে ওরা প্রাণ হারায়। তাহলে ঈষৎ উষ্ণ গরম জল তা থেকে মুক্তি দেবে? হা ঈশ্বর যাই কোথায়? এমতঅবস্থায় আমাদের শত্রু কে? বিশ্বাস, অবিশ্বাস, অন্ধবিশ্বাস!

বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর অনাস্থা – নাকি করোনা? আজ বা কাল করোনা তো শেষ হবেই, শেষ না হলে কন্ট্রোলে এসে যাবে, কিন্তু বিশ্বাস? তার মৃত্যু প্রতি নিয়ত ঘটে চলেছে সামনে একটু একটু করে। এমন আমাদের কথা বলার টেকনিক হয়ে গেছে কথা শোনার আগেই, আজেবাজে এসব অ্যাডজেকটিভ কথার আগে বসিয়ে দেওয়া। কিছু না পারলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া। কাকে চাইছি কোথায় চাইছি সেই জ্ঞানই তো এখন আমাদের আর নেই। শুধু কথার মায়াজাল। আরে বাবা সব কারণ বোঝার জ্ঞান সবার না ই থাকতে পারে। তাই প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করাটা জরুরী। কিন্তু উপর তলা থেকে উঠে আসা কথা যারা বলছে তাদের মনে রাখতে হবে সারা জীবনের জন্য তুমি কাউকে বোকা বানাতে পারবে না।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় শুনেছি রাতে ঘর পরিষ্কার করে আবর্জনা বাইরে ফেলা উচিত নয়। তাতে ঘরে চোর আসে। মানে চুরি হয় ঘরে। 

তখন শুনেছি আর ভেবেছি এত ছেলে ভোলাবার গল্প। কিন্তু ব্যাপারটা যখন বেশ কয়েকবছর পর শুনলাম তখন নিজেকে আহাম্মক বলে মনে হল। তখনকার দিনে সব ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি ছিলনা তাই রাতে ঘর পরিষ্কার করে আবর্জনা ফেললে মূল্যবান বস্তু হারিয়ে যাবার ভয় থাকে। তাই চুরির গল্পের ফাঁদে মানুষকে সংযত করা হলো। আমাদের চিরকালের বদ অভ্যাস সোজা জ্ঞান আমরা গ্রহণ করতে পারিনা। তাতে আমাদের এলার্জি আছে। গল্পের ছলে তাকে আমরা গ্রহণ করি। কিন্তু স্বল্প শিক্ষিত বোকা মানুষের দল সে কথার অনেকাংশেই বিশ্বাস করেছে। উপকার ও অপকার কতটা তা দাঁড়িপাল্লা দিয়ে না মেপে এটা তো বলা যেতেই পারে সমাজের রক্তে বিশ্বাসকে তারা জিইয়ে রেখেছে। আর আমাদের দিনে সুবিধাজনক এরা সেই বিশ্বাসকে নিজেদের প্রয়োজনমতো সিঁড়ি বানিয়ে ওপরে উঠে গেছে। শূন্যস্থান থাকে না। বিশ্বাস কমেছে অবিশ্বাস দখল করেছে সে জায়গা। 

করোনা যাবে একদিন কিন্তু বিশ্বাস সে যে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে সরে যাচ্ছে তাকে ফিরিয়ে আনবে কে? আগামী প্রজন্ম পূর্বজদের কতটা বিশ্বাস করতে পারবে? কোনো সন্তান হয়তো এই ডিজিটাল দুনিয়া সার্চ অপশনে ভর করে পিতা-মাতার সত্যতা যাচাই করতে চাইবে। ফেক নয় তো এরা তা যাচাই করবে। মানে বিশ্বাস তো গেল আর শ্রদ্ধাও গেল সাথে সাথে। সমাজের বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা এখন তলানিতে তখন কমিউনাল রায়ট লাগাতে হবে না এমনি লেগে যাবে। 

এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এক কবি, আজ বেঁচে থাকলে তার অঙ্গীকার হত বাসযোগ্য নয়, বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য।

Facebook Comments

You Might Also Like