নিবন্ধ সাহিত্য

শক্তিনির্ভেদ – তন্ময় দাস

শক্তিনির্ভেদ

 

“… আমাদের যাওয়া আসা সূর্যনিরূপিত
তোমার ছোঁয়ায় আলো
অন্ধকার করেছো নিশ্চিত;
আমিষ গন্ধের নীল ওড়ে অন্ধকারে
আকারে প্রকারে
লোকায়তিকের চোরাটানে
সূর্যের ঘোড়াও দেখি ভেঙেছে শৃঙ্খলা…”      [স্মরণে শক্তি চট্টোপাধ্যায়/ রাহুল পুরকায়স্থ]

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের ক্রান্তিলগ্ন তথা এক অস্থির সময়ে কলকাতার বুকে জন্ম নিয়েছিল একের পর এক পত্রিকাগোষ্ঠী। কোনটি মাসিক তো কোনটি সাপ্তাহিক। কোনটি পাক্ষিক তো কোনটি ঘান্টিক। সব মিলিয়ে লিটল ম্যাগাজিনগুলো সময়ের স্রোতে দাঁড়িয়েই সময়কে কাঁটাছেড়া করেছিল। বলা বাহুল্য আজও করে আসছে। ফলস্বরূপ উঠে আসে উদ্যমী উৎসাহী প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিক। সে সময়ে সুনীল-বিনয়-শক্তি নামগুলো এমনই নীহারিকার মতো উজ্জ্বল ছিল যে তার আলোকছটা সময়ের অন্ধকারকে যেমন আলোকিত করেছে, পাশাপাশি সাহিত্যের চিরন্তন প্রবাহমানতার ঐতিহ্যকে বজায় রেখে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে। এই ক্ষুদ্র আলোচনা সেই সময়ের মহত্তম কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। একটি মন্তব্য এই প্রসঙ্গে উপস্থাপন করলাম –

“পূর্ববর্তী কোনও কবির সঙ্গেই শক্তির তুলনা চলে না এবং শক্তির মতো আরও একজন কবি ভবিষ্যতে দেখা দেবেন, সে সম্ভাবনাও (আমার মতে) প্রায় নেই বললেই চলে।”     [অনুবাদক কবি প্রীতিশ নন্দী]

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে বহু বাক্‌-বিতন্ডা-বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদি হয়েছে ও হবে। তবু একথা বলতেই হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় রয়েছে শব্দের খেলা, ছন্দোবদ্ধ পদবিন্যাস, আর গভীর রহস্যময়তা। জীবনানন্দের কবিতার মতো রয়েছে দৃশ্যকল্পের অসাধারণত্ব যা সম্পূর্ণতই ওঁর নিজস্ব। অভিনেতা কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মনে করেন –

“তাঁর কবিতা আরও অনেকের মতোই আমি পাঠ করেছি মুগ্ধ বিস্ময়ে। শব্দ ব্যবহারে যেমন, তেমনই সেই ব্যবহৃত শব্দের ব্যঞ্জনায়। ঠিক যখন পাঠক ভাবতে বসবে, বেশ তো এগোচ্ছে কবিতাটা; যেন একটা চেনা ছাঁচের নাগাল পাওয়া গেল, তৎক্ষণাৎ শক্তি এমন একটি চরণ লিখে বসবেন যা সমস্ত ভাবনার পরিচিত ছাঁচকে এলোমেলো করে দেবে।”

এমনই একজন শক্তিশালী কবি হলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। স্বভাব কবিদের মতোই সময়ের বেড়াজালকে তিনিও উপেক্ষা করতে পারেন নি। সমকালীন মূল্যবোধের অবক্ষয়; সমাজ-ধর্ম-অর্থ-প্রেম ইত্যাদি নানাবিধ সংকটকে তিনি উপলব্ধি করেছেন। পাশাপাশি সংকটের মূলে অবগাহন করে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে সেগুলি বিচার করেছেন। আর সাথে সাথেই নির্মাণ করেছেন উত্তরণের পথ। যুগ-যুগান্তর ধরেই কবিরা যুগ-সংকটে চুপ করে বসে থাকেন নি। কেউ শান্তির ললিত বাণী শোনায় তো কেউ অস্ত্র বঞ্চনার কথা। আবার কিছু কিছু কবি এসব মিলিয়ে নতুন দিগন্তের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঐ তৃতীয় শ্রেণীর কবি যাঁর কবিতায় আছে পেলব পরশ কিন্তু চাবুকের শক্তি। হিরণ মৈত্রের ব্যক্তিগত লেখনী থেকে পাওয়া যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন – শান্তিনিকেতনে বসে কবিতা লেখা যায় না।

Shakti Chattopadhyay Diganto Patrika

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় (নভেম্বর ২৭, ১৯৩৩ – মার্চ ২৩, ১৯৯৫)

বিশ শতকের ষাটের দশকের রক্তাক্ত অধ্যায়ে কোনো কবিই সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিকে নিজের কবিতা থেকে দূরে রাখতে পারেন নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রথম জীবনে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকলেও পরে দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তবুও ঐ রক্তাক্ত দিনগুলিতে বিপ্লবের দামামা যখন বেজেছে তখনই কবির কলমে উঠে এসেছে সে বর্ণনা। মুণ্ডহীন তরুণের উজ্জ্বল বিমূঢ় দেহ দেখে হতচকিত হয়েছেন। প্রশ্ন করেছেন – এ নিদারুণ হত্যার মায়াহীন ক্রোধের কারণ ? আর লিখেছেন –

“কোন অপরাধে এক প্রাণবন্ত জীবন আঁধারে ?
ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, ও শুধু বিপ্লব চেয়ে দোষী?”       [রক্তের দাগ]

এই দুর্বিষহ অস্থির সময়ে রাজনৈতিক নেতাদেরও কটাক্ষ করতে ভোলেন নি। যখন মানুষ খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধানে উর্দ্ধ নিঃশ্বাসে দৌড়ে বেড়াচ্ছে তখন নেতৃবৃন্দের আচরণকে ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করে তাদের স্বরূপ উদঘাটনে কবি বদ্ধপরিকর। আমরা দেখতে পাই কবির নির্ভেজাল সাহসিকতা –

“রাজনীতির ভাষ্যকার নেমন্তন্ন খাবে এসে মাঝরাতে চাঁদের মতন
বলবে, গূঢ় গুহ্য তার ছলাকলা ইন্দ্রজাল,
কালো টাকা আলো করা মেশিনের নমুনা দেখাবে”।        [পোড়াতে চাই]

প্রসঙ্গত উল্লেখ করতেই হয় সমকালীন হাংরি আন্দোলনের কথা। কলকাতার তরুণ একদল কবি এই আন্দোলনে যখন ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখনও সুপরিচিত কবির তকমা না থাকায় আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে বলা হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে। নেতৃত্বের ক্ষমতাধারণে সক্ষম মানুষকেই তো সবাই নেতারূপে বিবেচনা করে – এতে দ্বিমত কোথায়?

 .

কলকাতার নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন ঐ ভয়াবহ দুর্বিষহ সময়েও যেমন নির্বিকার তেমন আজও সমানভাবেই অচেতন। দেশ-সমাজ সম্পর্কে অচেতন মধ্যবিত্তকে কবি উপলব্ধি করতেন। ‘নিজের নিজের আর নিজের’ – এরকম ভাবে বাঁচাটাই আজ বাঙালির সার্বিক চিত্র। এদের কাছে নিজের গণ্ডীর বাইরে দেশ-সমাজ-পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে কোন দায়বদ্ধতা নেই। আলসেমির মালিশেই তারা সারাদিন দেহ-ম্যাসাজে ব্যস্ত। এ মধ্যবিত্ত ভীরু, কাপুরুষ। না বুঝে ভোট দেওয়া, খবরের কাগজ নেড়ে তর্ক করা, আর বেশি জানে – এইরূপ ভঙ্গি করেই তারা সুখে বেঁচে-বর্তে থাকে। শক্তির কবিতায় রয়েছে সেই অবক্ষয়িত মধ্যবিত্তের কথা –

“অধিকাংশ আলস্যে কাতর
তাই শুয়ে বসে থাকে মনোভঙ্গি নবাবের মতো
প্রগতি বিমুখ
কুৎকার এড়িয়ে শুধু বেঁচে থাকে; ভোট
দিতে থাকে” …                         [শুধু বেঁচে থাকে]

‘অরণ্য বাড়ি আছো’ কবিতায় এ যন্ত্রণা আরও স্পষ্ট। মূল্যবোধহীন সমাজ, মানুষের চেতনার অসুস্থতায় কবিতাটি অনবদ্য। ভাষা ও চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবনের ব্যক্তিস্বার্থের ব্যঞ্জনা। ‘অরণ্য’ এখানে যন্ত্রণাদগ্ধ অস্থির উদ্বিগ্ন এক আধুনিক সত্তা, কবির বিবেক। রাতের কড়া নাড়া সে শুনতে পায়। এ হল মানবিকসত্তার জাগরণের ইঙ্গিত –

“দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
অরণ্য বাড়ি আছো ?”                  [অরণ্য বাড়ি আছো]

যুগের অবক্ষয় মানুষকে অমানবিক করে তোলে। হিংসার জাঁতাকলে একে অপরকে ঘৃণা করে; কুৎসা রটনা করে। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন থেকে সরে এসে ‘একা-একা’ বাঁচবে চিন্তা করে। ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’ কবিতায় রয়েছে এই সংকীর্ণ একাকীত্বের যন্ত্রণা –

“আমরা ক্রমশই একে অপরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি…
… অনেকদিন আমরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করিনি
অনেকদিন আমরা ভোগ করিনি চুম্বন মানুষের
অনেকদিন গান শুনিনি মানুষের
অনেকদিন আবোল তাবোল কিছু দেখি নি আমরা।”

 .

ব্যক্তির মূল্যবোধের অবক্ষয়ে যে প্রকৃতির ভূমিকা বিজড়িত – এ সত্যও কবি উপলব্ধি করেছেন। পরিবেশের সংকটকেও তুলে এনেছেন কবিতায়। নগর সভ্যতার ইঁট-কাঠ-ভরা জীবনে নেই সবুজের মেলা। মানুষ আজ রোগী। অসুস্থতা তাদের গ্রাস করে চলেছে প্রতি নিয়ত। কবি দেখেন, সে সবুজ অরণ্যে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ একত্রে বসবাস করেছে – আজ সেই সবুজের বড়ো অভাব। আমাদের উচিত সেই সবুজের সমারোহ করা –

“আরোগ্যের জন্য ঐ সবুজের ভীষণ দরকার…
… বহুদিন শহরেই আছি
শহরের অসুখ হাঁ করে কেবল সবুজ খায়
সবুজের অনটন ঘটে…
… গাছ আনো, বাগানে বসাও
আমি দেখি।”                   [আমি দেখি]

এমনই জটিল সময়ে শক্তির কবিতায় বারবার প্রতিফলিত হয়েছে ‘সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়’। চারিদিকে ভয়াল রাজনীতি, ভঙ্গুর অর্থনীতি, ফাঁকা হৃদয় যেন ভয়ঙ্কর নখের আঁচড় কাটছে। প্রেম-ভালোবাসার মূল্য নেই; উদরপূর্তি ঘটে না, এ সমাজে কি বাঁচা যায় ? ভালোভাবে বাঁচার প্রশ্ন পরের কথা কারণ এসময় কি কেউ ভালো থাকতে পারে ? কবি এ সত্য উপলব্ধি করেছিলেন বলেই কবিতায় পাই বেঁচে থাকার রাস্তা –

“পিছনে জল অথৈ আর সামনে আছে জ্বালা
দূর দেশের শিশুর কান বোমায় করে কালা
চেখের কাছে আঁধার – প্রাণ বাঁধার মন বাঁধার
কাজ কি শেষ এই দেশে ?
চলো না যাই ভিয়েতনাম সকল গ্রাম ভরিয়ে দিই
চলো না যাই সেখানে প্রাণ শতেক ধান ছড়িয়ে দিই
সেই দেশে !”              [পিছনে জল অথৈ আর সামনে আছে জ্বালা]

এভাবেই কবি মানুষের উপর চির-আস্থাবান। শক্তির কবিতায় রয়েছে সংকট; আবার সংকট থেকে উত্তরণের পথ। আর তাই তো অন্যায়ের কাছে, অন্ধকারের কাছে মাথা নুইয়ে নয়, শিরদাঁড়া সোজা করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে হয়। পালিয়ে গেলেই কি বাঁচা যায় ? কতদূর যাওয়া যাবে ? দেওয়ালে তো পিঠ ঠেকবেই। বিষাক্ত সময়ের থাবা তাকে গ্রাস করবেই। তাই তো ভবিষ্যতের জন্য ভাবতে আমরা বাধ্য হব আর মাথা উঁচু করে বলব –

“যেতে পারি –
যে কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো ?
সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো।“ [যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো]

এ কবিতা শাশ্বত; এ কবিতা চিরন্তন। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ – এ আকাঙ্ক্ষা থাকলেও এখানে রয়েছে প্রার্থনা, অনুনয়ের বদলে অধিকার অর্জনের কথা ‘কিন্তু কেন যাবো’। এভাবেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে পাই শক্তিশেলের কথা। আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধার্ধে যে ভয়ংকর সময় উপস্থিত, সেখানে তাঁর মত শক্তিশালী কবির একান্ত প্রয়োজন। তাই তো কবি জয় গোস্বামী শক্তিস্মরণে লেখেন-

“… রাস্তায় রাস্তায় লোক, গাড়ি চলছে, নমস্তে, জল চলছে, নমস্তে, রাত্রি চলছে, নমস্তে, সামনে সামনে সাঁতরে যাচ্ছে হাজার ছেলের দল, কেউ দেখতে পাচ্ছে না, পরলোক থেকেও উঠে এসেছে সহস্র বছরের মৃত সব কবি, গাড়ি চলছে মন্থর …

… আমি দেখতে পাচ্ছি, শত শত মৃত কবি, খ্যাত অখ্যাত, প্রাচীন রচনার তলায় লেখা ‘অ্যাননিমাস’ শব্দ থেকেও আজ শরীর ধরে উঠে এসেছে কেউ কেউ এ মিছিলে, মিছিল চলছে…”                  [শোকযাত্রার প্রতিবেদন / জয় গোস্বামী]


পড়ুন ‘সুস্বাগতম দুর্জয়া’ >> 

shaktinirved tanmoy das
Facebook Comments

You Might Also Like