ছোটগল্প সাহিত্য

পাঠকের নোটবুকঃ অমৃতফল (পর্ব ২/৬) – সুদীপ পাঠক

দাদুর চোখে জল! দাদু কাঁদছে! তার জন্যই আজ সকলের সামনে দাদুর এই রকম হেনস্থা। এতো সবের মূলে একমাত্র সে দায়ী। নিজের ওপর একটা ভীষণ রকম লজ্জা আর রাগ হলো তার। বুদ্ধু চিৎকার করে বলল

— দাদু কেঁদো না, আমি এইখানে। 

সবাই এক সঙ্গে মুখ তুলে চাইল। এক লহমায় সবাই অবাক! বড়মামা চোখ পাকিয়ে বলল 

— বাঁদর ছেলে, নেমে আয় শিগগিরি।

বুদ্ধু নীচে নামতেই তার মা ঠাস করে এক চড় কষালো তার গালে। তার পর নিজেই কেঁদে ফেলল। বুদ্ধু কিন্তু এক ফোঁটাও কাঁদেনি। ঠিক এমন সময় ফুটকি বলে উঠলো 

— এ রাম! দাদা তুই ন্যাংটা? 

সঙ্গে সঙ্গে সে হাত চাপা দিয়ে ধমক দিল

— আহ্ ফুটকি, কি হচ্ছে টাকি? তুই এখানে বড়দের কথার মাঝে কি করছিস? যা এখান থেকে। এবার দাদামশাই তাকে কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন

— দাদু ভাই তুমি আমাকে বাঁচালে। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। 

চার : 

এই ঘটনার দেড় বছরের মাথায় দাদামশাই দেহ রাখলেন। শেষের দিকে বসতবাড়ীতে আর থাকতেন না। ঐ চালাঘরই তাঁর শেষ আশ্রয় হয়েছিল। হঠাৎ কেনো এই সিদ্ধান্ত নিলেন? সে কথা কেউ জানতে চাইলে তার উত্তর হতো 

— এ হলো আমার বানপ্রস্থ আশ্রম। অনেক তো দেখলাম আর কেনো। সংসার ধর্ম, সুখভোগ, সবই তো হলো। এখন বয়েস কালে এই আমার পরম শান্তি। যে কটা দিন আছি এখানে এই মুক্ত আলো বাতাসের মধ্যে থাকতে চাই। আর এখানে শুয়ে এই গাছটাকে ও সর্বদা দেখতে পাই যে। 

নটেবুড়ির বয়েস কতো তা কেউ বলতে পারবে না। স্বয়ং নটেবুড়িও না।

মৃত্যু যে আসন্ন সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বৌ ছেলে, পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন সকলেই যেন ঐ অবধারিত ঘটনার প্রতীক্ষায় ছিল। শুধু দিন গোনা, অবশেষে এলো সেই চরম দিন। নামগান সংকীর্তন শুনতে শুনতে ধরণীধর চক্রবর্তী চোখ বুঁজলেন। দাদামশাইয়ের শেষ সময় বুদ্ধু সেখানে উপস্থিত ছিল না। পরে শুনেছে যাবার আগে দাদামশাই দিদিমার হাত দুটি ধরে বলেছিলেন, ‘ঐ গাছটাকে তুমি দেখো। ওর যত্ন পরিচর্যা কোরো। ওর ভিতরে আমার আত্মাকে রেখে গেলাম। যতদিন ওটা থাকবে জানবে আমি আছি। আর দাদুভাইকে বোলো গাছটা আমি তাকে দিলাম। যখনই আমাকে দেখতে ইচ্ছে যাবে তখনই ঐ গাছের তলায় যেন চলে আসে। তাহলেই সে আমাকে পাবে।’ 

ঐ শেষ ইচ্ছেটাই দিদিমা ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেন। নবাবপসন্দের গাছটাকে দেখভাল করাই যেন তার ধ্যানজ্ঞান হয়েছিল। কেউ জানতে চাইলে বলতেন 

— হ্যাঁ ভাই বুড়ো বয়েসে সতীনের সেবা করাই লেখা ছিল কপালে। ওনার আদেশ মাথায় তুলে নিয়েছি। এখন ঐ গাছটাই আমার ধম্মকম্ম, ঐ আমার সব। 

কিন্তু বুদ্ধু যেবার প্রথম ফলটা পেড়েছিল তারপর থেকে পাঁচ বছর কেটে গেল, গাছে আর একটিও ফল ধরেনি।

পাঁচ বছর পর এক নিস্তরঙ্গ বৈশাখ মাসের শেষ তারিখে ভোররাতে দিদিমার বুকের বামদিকে একটা অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হল। পাছে কারোর ঘুম ভেঙে যায় তাই কাউকে না জানিয়ে একা চলে গেলেন ঘরের বাইরে। ভেবেছিলেন খোলা আকাশের নীচে মুক্ত বাতাসে কিছুটা পায়চারি করতে পারলে বোধ হয় যন্ত্রণার উপশম হবে। সকাল হলো, বাড়ীর সকলের ঘুম ভাঙলো, দিদিমার খোঁজ পড়লো। তাঁকে পাওয়া গেলো পিছনের জংলা জমিতে। দিদিমার নিথর দেহটা পড়েছিল নবাবপসন্দের গোড়ায়। একটা হাত ছিল বুকের বামদিকে আর একটা হাত ছুঁয়েছিল গাছটাকে। 

বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময় দিদিমাকে চিরতরে আগুনের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সকলে বাড়ী ফিরলো। তখন সবার চোখের অলক্ষ্যে নবাবপসন্দের সব থেকে উঁচু ডালে একগুচ্ছ মুকুল ধরেছিল। সে বছর ফলন হয়েছিল প্রচুর। ফলে ফলে গাছ ভরে গিয়েছিল, পাতা দেখা যায় না। আমের ভারে কচিগাছটা যেনো নুয়ে পড়েছিল মাটিতে। আত্মীয় স্বজন গ্রামের লোক সবাই খেয়ে একবাক্যে বলেছিল ‘অপূর্ব’।

ঐ শেষ ইচ্ছেটাই দিদিমা ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেন।

পাঁচ : 

দিদিমা চলে যাবার পর দেখতে দেখতে সতেরটা বছর পার হয়ে গেলো। তাকে বুদ্ধু বলে ডাকার লোক এখন হাতে গোনা কয়েকজন রয়েছে মাত্র। দাদামশাই দিদিমা না থাকলেও মা আর ফুটকির হাত ধরে প্রতিবছর নিয়ম করে বিজয়ার প্রণাম সারতে বুদ্ধু মামারবাড়ীতে আসতো। সেই রেওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে আজ প্রায় সাত বছর হল। এখন সে একজন প্রবাসী বাঙালী, ইউরোপের বাসিন্দা। আই টি সেক্টরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। গ্লোবাল ভয়েসেস পত্রিকায় তার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। তার পর থেকেই লন্ডনের অভিজাত মহলে বুদ্ধদেব গাঙ্গুলীর নামটা বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। এখন কালেভদ্রে অফিসের কাজে দুতিন দিনের জন্য ঝটিকা সফরে কলকাতায় এলেও আপ্রাণ চেষ্টা করে একবার মামারবাড়ীতেঢু মেরে যাওয়ার। বুদ্ধু ডাক শোনার জন্য তার মনটা ছটফট করে। ভীষণ ইচ্ছে করে উত্তর কলকাতার সেইসব পুরোনো পাড়ায় গিয়ে পরিচিত মুখ গুলো খুঁজতে। কে কেমন আছে তা কে জানে! বর্ষার সন্ধ্যায় রাজুর বাড়ীতে কাকীমার হাতের তৈরী গরম গরম মটর ডালের বড়া সহযোগে চা আর সেই সঙ্গে তুমুল আড্ডা। সে সব এখন শুধুই সুখস্মৃতি, ইচ্ছে থাকলেও অবকাশ নেই। এই তো সেবার যখন দু দিনের জন্য কলকাতায় এসেছিল, হঠাৎ সকালবেলা ইচ্ছে হলো বাগবাজারে গঙ্গার ধারে ঘুরে আসতে। সাতসকালে ঘাট ফাঁকা একটি মাত্র মানুষ স্নান করছে। বুদ্ধু বসেছিল ওপরের সিঁড়িতে। সেই মানুষটি কাছে আসতেই চিনতে পারলো। ‘আরে তিমিরবরণ স্যার না!’ সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিত, অগাধ পড়াশোনা আর জ্ঞানের অধিকারী। তিমিরবাবু প্রথমটায় চিনতে পারেন নি। বুদ্ধু কাছে এগিয়ে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে পরিচয় দিতেই বৃদ্ধ মানুষটি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন — এখনো এই বুড়োটাকে তোর মনে আছে? 

স্টেশন থেকে বের হয়ে রাস্তায় পা দিতেই একেবারে মুখোমুখি দেখা।

— ভুলব কি করে স্যার! কম পিটুনি খেয়েছি আপনার হাতে? এখনো পিঠে বেতের দাগ রয়ে গেছে যে। আপনিও কি আমাকে ভুলতে পেরেছেন স্যার? এমন বেয়াড়া ছাত্র তো দ্বিতীয় পাননি তাই না? 

— সত্যি কথা বলতে কি তোদের পুরো ব্যাচটাকেই ভুলতে পারিনি। আমার দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের শিক্ষকতার জীবনে সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট গ্রুপ ছিল তোদের। 

কুশল বিনিময়ের পর স্যার জানতে চাওয়ায় বুদ্ধু তার বর্তমান পরিচয় দিল। তিমিরবাবুর মুখ থেকে অস্ফুটে একটা শব্দ বের হল ‘অভাবনীয়’। একটু থেমে তিনি আবার বললেন 

— আসলে কি জান বাবা স্মৃতি নামক বৃহৎ গ্রন্থের ওপর পুরু ধুলোর আস্তরণ পড়ে গেছে। তাই প্রথমে একটু অসুবিধা হয়। তবে একবার ঝাড়পোঁছ করে নিয়ে বইটা খুলতে পারলেই পাতায় পাতায় চমক। তুমি ভালো থেকো আরো উন্নতি করো, চললাম… 

তিমিরবরণ স্যার চলে যাবার পর বুদ্ধু সেখানে বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিল। এই একজন মানুষ যিনি জীবনে কোনো দিন মিথ্যা কথা বলেন নি। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নিয়মিত গঙ্গাস্নান করেন। এখনো বুড়োহাড়ে রুটিন মাফিক করে চলেছেন, কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। আজকের দুনিয়ায় এও কি কম আশ্চর্য্যের কথা! 

নটেবুড়ির বয়েস কতো তা কেউ বলতে পারবে না। স্বয়ং নটেবুড়িও না। দিদিমা তাকে নটেবুড়ি বলে ডেকেছে, মা তাকে নটেবুড়ি বলে ডেকেছে বুদ্ধু নিজেও ছোটবেলা থেকে তাকে ঐ নামেই ডেকে আসছে। দিদিমার কাছে সে শুনেছে কি করে তার ঐ নামকরণ হলো। জল কমে গেলে পুকুর পাড়ের মাটিতে যে নটেশাক গজায় বুড়ি সেই তুলে নিয়ে গিয়ে নুন দিয়ে সেদ্ধ করে খেত, সেই থেকে তার নাম হলো নটেবুড়ি। 

স্টেশন থেকে বের হয়ে রাস্তায় পা দিতেই একেবারে মুখোমুখি দেখা। বুদ্ধুর মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো

— আরে নটেবুড়ি না! 

— কেডা? 

এবার মাথা তুলে দেখলো, তারপর 

— অ বুদ্ধুবাবু! তা কি খপর? ভালো আছো তো? 

— হ্যাঁ ভালো। তা তোমার খবর কি? 

— এই তো দেখতেই পাচ্চো, যাবার দিন গুনচি। 

— এখনই যাবে কি গো! তোমার এখনো গুটি কতক দাঁত পড়তে বাকী আছে যে। আর চোখের যেরকম সাংঘাতিক জ্যোতি! নিশ্চই ছানি পড়েনি? তোমার যাবার এখন ঢের দেরী। 

— ঐ অভিশাপ দিউনি বাপ! আর যে সইতে পারি নে। তা তুমি হঠাৎ কাজকম্ম সব ফেলে রেখে কি মনে করে এলে শুনি? ও বুজিচি তুমি তো ভাগ্নে তাই ভাগ নিতে এয়েচ বুজি? তা ভালো কতা। হেঁ হেঁ হেঁ…  নটেবুড়ির হেঁয়ালির অর্থটা পরিষ্কার হলো মামার বাড়ীতে পৌঁছনোর পর। জলখাবারের পর্ব মেটার পর বড়মামা আসল প্রসঙ্গটা উত্থাপন করলো। নতুন পারিবারিক সম্পত্তি আইন তৈরী হওয়ার ফলে বর্তমান পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দাদামশাই এবং দিদিমা গত হয়েছেন বহুকাল হলো। এইবার দুই মামা মিলে জমিজিরেত বাগান পুকুর এবং অবশ্যই বসতবাড়ী এই সব কিছু পাকাপাকি ভাবে হস্তগত করতে চায়।

আরও পড়ুন>> পাঠকের নোটবুকঃ অমৃতফল (পর্ব ১/৬)

আরও পড়ুন >> যত সব বাগাড়ম্বরঃ পাঠকের নোটবুক >>

(ক্রমশঃ) পরবর্তী পর্ব Coming Soon 20 June, 2020

Facebook Comments

You Might Also Like