থিয়েটার বিনোদন

৫২তম বর্ষে নীহারিকা-র মননশীল সন্ধ্যাযাপন

সারা মাস ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আপামর বাঙালিকে মাতিয়ে রাখল সদ্য বাহান্ন তম বর্ষে উপনীত ব্যারাকপুর নীহারিকা নাট্যগোষ্ঠী। ১৬ ই জুন শনিবারের সাঁঝবেলায় সুকান্ত সদন প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চস্থ হয় নাট্যগোষ্ঠীর মঞ্চ প্রযোজনার নবতম সংযোজন ‘এক যে ছিল চোর’। মধ্যপ্রাচ্যের প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং তার মাঝে এক চোরের জীবন সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে নাটকটি রচনা করেছেন শ্যামাকান্ত দাস এবং মঞ্চে তার সফল প্রয়োগ করেছেন সোমনাথ খাঁ। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সুবীর কুমার বিশ্বাস অত্যন্ত সাবলীল। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এবং দক্ষ নাট্যাভিনেতা সুবীর কুমার বিশ্বাসের পাশে একইসাথে মঞ্চাভিনয়ে তরুণ তুর্কি শৌর্য বিশ্বাস এবং মহাশ্বেতা ঘোষ অনবদ্য ছাপ রেখেছেন। ভবি ঠাকুর-এর আবহ, মনোজ প্রসাদ-এর আলোকসম্পাত নাটকটিকে এক মনোজ্ঞ ভাবময়তায় সার্থক ভাবে উন্নীত করেছে। রাজ্য নৃত্য, নাটক, সঙ্গীত ও দৃশ্যকলা আকাদেমি-র সদস্য সচিব ডাঃ হৈমন্তী চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং ভারত সরকারের সঙ্গীত নাটক আকাদেমির আর্থিক সহায়তায় অনুষ্ঠিত এই নাট্যসন্ধ্যার সূচনা করেন। ২৪ শে জুন রবিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সমসাময়িক সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এক আলোচনা সভা যার মূল আলোচিত বিষয় ছিল বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কি নাটক লেখা এবং করা উচিত। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি ডঃ অপূর্ব দে-র নিপুণ সঞ্চালনায় আয়োজিত হয় ব্যারাকপুর এ.বি. মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাট্যকার শিবঙ্কর চক্রবর্তী, নাট্যকার ও পরিচালক শান্তনু মজুমদার এবং নাট্যকার-পরিচালক ‘কোজাগরী’ কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। 

শিবঙ্কর চক্রবর্তী জানান যে তিনি প্রেক্ষাপটকে ঐতিহাসিক বা বর্তমান যুগে ভাগ করার পক্ষপাতী নন। মহাভারতের সময় থেকে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধিত হয়েছে অনেক বেশী, জনজীবনের গতিময়তা যথেষ্ট দ্রুত হয়েছে, কিন্তু সামাজিক সভ্যতা-র প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন সাধিত হয় নি। ফলে দর্শকদের মননে স্থান করে নেয় সেই সব নাটক যা ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ কিন্তু অবচেতনেই দর্শককে উন্নীত করে অনন্য মানবিক বোধে। 

আবার হীনমন্যতা থেকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ওঠার পথ – এই সামগ্রিক যাত্রাকে নাটক আখ্যা দিয়ে কৌশিক চট্টোপাধ্যায় জানান যে তিনি থিয়েটার বলতে কেবল মঞ্চ, আলোকসম্পাত, পরিচ্ছদ, অভিনয়-কে বুঝতে চান না। সমগ্র দৈনন্দিন জীবনযাপনকে থিয়েটার প্রভাবিত করে। তার সেই থিয়েটারই করতে হবে যা মানুষকে ভাবতে শেখায় এবং এগিয়ে নিয়ে যায় সদর্থক ভূমিকায়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে নাট্যকর্মী সমীর কুমার বিশ্বাসের একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শান্তনু মজুমদার জানান, থিয়েটার কেবল প্রদর্শন নয়, থিয়েটার আসলে দর্শন, যে দর্শন দর্শকের জীবনভাবনাকে পরিবর্তন করে। অনেক ক্ষেত্রে নাটক রচনা ও তার নাট্যরূপ দানে এই দর্শনের বিভেদ প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে। আগামী প্রজন্মের হাতে থিয়েটারের ব্যাটন তুলে দেওয়ার আহ্বান তিনি জানিয়েছেন।

সমগ্র আলোচনাসভা প্রয়াত নাট্যকার-পরিচালক তাপস দাশগুপ্তের স্মরণে উৎসর্গ করা হয়। নীহারিকা নাট্যগোষ্ঠী আবারও জানিয়ে দিল, থিয়েটার আসলে কর্মকাণ্ড নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনের মতোই হল থিয়েটারযাপন, চেতনে হোক, বা অবচেতনে।


niharika 52 year
Facebook Comments

You Might Also Like