চলচ্চিত্র বিনোদন

যেসব সমাধানহীন প্রশ্ন করে গেলেন সুশান্ত সিংহ রাজপুত – অভিষেক ঘোষ

সুশান্ত সিংহ রাজপুত চলে গেলেন । বান্দ্রার ফ্ল্যাটে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হল । এই প্রসঙ্গে গত সন্ধ্যা থেকে আন্তর্জালে অ্যাবসার্ডিস্ট দার্শনিক Albert Camus -এর একটি উদ্ধৃতি চোখে পড়ে — যেখানে তিনি বলছেন, জীবনের চরমতম প্রশ্ন, আত্মহত্যা করবো না কেন ? কিন্তু সেই কামুই একথাও বলেছিলেন, — ‘‘But in the end one needs more courage to live than to kill himself.’’ । যদিও আমাদের জীবনানন্দ ছিল, ছিল ‘আট বছর আগের একদিন’, উদ্ধৃতি ছিল, — “প্রেম ছিল, আশা ছিল— জ্যোৎস্নায়– তবু সে দেখিলকোন্ ভূত ? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার ?অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল— লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার”।

‘কাই পো চে’ মুভিঃ অফ স্ক্রিন

হ্যাঁ সত্য হল বছরটা চরম যন্ত্রণার — করোনা অতিমারীর — মৃত্যু সেখানে একটা খবর মাত্র । লাখো লোক মরছে … সুতরাং ! ঠিকই …. কিন্তু তাও কিছু কথা বাকি থেকে যায় । মৃত্যুই পৃথিবীর ও মরজীরনের চরমতম ও মহত্তম সত্য । কিন্তু কিছু প্রাণ, কিছু জীবনের আবেদন নেহাৎ ব্যক্তিগত থাকে না । সাহিত্যিক, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ, বিনোদন জগতের মানুষেরা আমাদের পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে আনন্দ দান করেন । আমাদের ব্যক্তিগত শোক ভুলতে, সিদ্ধান্ত নিতে, সাফল্য পেতে নিজেদের অজান্তেই উৎসাহিত করেন । শচীনের একটা ইনিংস পারতো একজনের জীবন বদলে দিতে । গানে লতা মঙ্গেশকর পারতেন । অভিনেতারাও পারেন । তাই তাঁদের জীবন শুধু তাঁদের নয় । কোটি কোটি ভক্তেরও । তাই এই সংকটময় বছরে, যখন ভারতে প্রায় দশ হাজার মানুষ একটা ভাইরাসের শিকার হয়ে মুছে গেল জীবনের ছায়াছবি থেকে, যখন পরিযায়ী শ্রমিকেরা নিয়মিত মুছে যাচ্ছেন হাঁটতে হাঁটতে, যখন পচা-গলা লাশ দাহ হয় না, তখনও স্বপ্ন বেঁচে থাকে । তখন, হ্যাঁ তখনই বেশি করে আমাদের প্রয়োজন হয় সুশান্ত সিংহ রাজপুতদের । কারণ তাঁরা পর্দায় আমাদের লড়তে শেখান — কখনো মহেন্দ্র সিংহ ধোনি হয়ে, কখনোবা ‘কাই পো চে’-র সেই সাধারণ ছেলেটি হয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিল ও জিতেছিল । হ্যাঁ এই তো জীবন — এভাবেই তো আমরা অন্য জীবন জড়িয়ে বাঁচি । এভাবে কেউ সহসা হাত ছেড়ে দিলে, অনেক হাত ছেড়ে যায় ।

‘রাবতা’ মুভিঃ কৃতি স্যানন-এর সাথে সখ্যতা

সুশান্ত সিংহ রাজপুত মানুষ ছিলেন এবং ছিলেন তারকা-ও । তাই যে দেশে রোজ ছাত্র-ছাত্রীরা আত্মহত্যা করে অপূর্ণ স্বপ্নের ক্ষোভে, বাবা-মায়ের চাপে, সম্পর্কের ব্যর্থতায়, মনস্তত্ত্বিক সংকটে, সেখানে সুশান্ত সিংহ রাজপুত-রাই বাড়তি গুরুত্ব পান । আমরা জানি না, ঠিক কী ঘটেছিল ? এ মৃত্যু কি আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু ! অঙ্কিতা লোখন্ডে, রিয়া চক্রবর্তী, মা ঊষা সিংহের (২০০২) মৃত্যু, করোনা-কালীন অবসাদ, মানসিক স্বাস্থ্য হানি, কেরিয়ারের পরিকল্পিত ও কাঙ্ক্ষিত উন্নতির পথে ক্রমাগত প্রতিবন্ধকতা — এসব নানা প্রশ্ন উঠে আসছে তাঁর চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে । অথচ মানুষটার এই চৌত্রিশ বছরের জীবন কম ওঠাপড়া দেখে নি । মায়ের মৃত্যু, বিহারের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে দিল্লিতে চলে আসা ও মানিয়ে নেওয়া, ভারতের তৎকালীন একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সপ্তম স্থান দখল, পদার্থবিদ্যায় ন্যাশনাল অলিম্পিয়াড জয়, তারপর সহসা নাচ-অভিনয়, পড়াশোনায় সফল কেরিয়ারের সম্ভাবনা ভুলে অভিনেতা হতে চাওয়া — এ জীবন অনেক নাটকীয়তায় ভরা । প্রাণোচ্ছ্বল, তরতাজা জীবন এত সহজে ফুরিয়ে যায় কি করে, এ প্রশ্নই আমাদের বিব্রত করে সবচেয়ে বেশি । এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই — “জীবনের এই স্বাদ– সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের–তোমার অসহ্য বোধ হ’লো !” – কেন ?

নিউজিল্যান্ড সিরিজের পর মহেন্দ্র সিংহ ধোনির সাথে হাস্যময় সুশান্ত

শামক দাভরের ড্যান্স ক্লাস — ব্যারি জনের অভিনয়ের ক্লাস — মুম্বইতে আগমন ও নাদিরা বাব্বরের ‘একজুট’ থিয়েটার গ্রুপে যোগদান —  বালাজি টেলিফিল্মসের নজরে আসা ও একে একে ‘কিস দেশ মে হ্যায় মেরা দিল’ (প্রীত), ‘পবিত্র রিস্তা’ (মানব) — নাচের রিয়্যালিটি শো ‘যারা নাচকে দিখা’ — ‘ঝলক দিখলা যা’ — অভিষেক কপুর পরিচালিত, চেতন ভগত আশ্রিত, ‘কাই পো-চে’-র লড়াকু তরুণ ঈশান ভাট — হ্যাঁ সুশান্তের ছোট্ট জীবনে এসব ঘটে গিয়েছে — যা আমার-আপনার গোটা জীবনেও কোনোদিন ঘটবে না হয়তো ! ‘কাই পো-চে’ (২০১৩), ‘পিকে’ (২০১৪), ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ (২০১৫), ‘এম এস ধোনি’ (২০১৬), মাঝে একটা খারাপ বছরের পরেই ‘কেদারনাথ’ (২০১৮), ‘ছিছোরে’ (২০১৯) — না এমন কিছু হাবুডুবু খায় নি তাঁর কেরিয়ার । অমিতাভ বচ্চনের কেরিয়ারও এরচেয়ে অনেক খারাপ ছিল শুরুতে । কিন্তু হ্যাঁ তিনি লড়ে গিয়েছিলেন । সুতরাং এই অমীমাংসিত রহস্যের কোনোদিনই কোনো কিনারা হবে না যে, মানুষ এভাবে চলে যায় কেন, ডাক না আসার আগে !

সুশান্ত সিংহ রাজপুতের শেষ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টঃ মায়ের সাথে (ইন্সটাগ্রাম)

বছর কয়েক আগের কথা — আসলে হুড়মুড়িয়ে আসা অঘটনের ভিড়ে ঘটনাটা আমরা ভুলেই গেছি । ‘নিঃশব্দ’-খ্যাত জিয়া খানের মৃত্যু । সেদিন জিয়ার পরিকল্পনা ছিল সন্ধ্যাটা ‘গেম অব থ্রোনস্’ দেখে কাটানোর । বছর ২৫ -এর হিরোইন জিয়া রাতে হিথরো থেকে উড়ে আসা বোন কবিতা-কে স্বাগত জানাতে জেগে থাকতে চেয়েছিলেন, যাঁর পৌঁছানোর কথা ছিল ভোর তিনটেয় । সেদিন সকালে জিয়া বেশ কিছু শপিং-ও করেছিলেন কবিতার জন্য, কিছু সোনার গয়নাও কিনেছিলেন । ফ্লাইট হিথরো ছেড়ে উড়ান নেওয়ার আগে পর্যন্ত দুজনে মোবাইলে নন-স্টপ টেক্সট্ আদান-প্রদান করেছেন, একে অপরকে কতক্ষণে দেখবেন তার উৎসাহ-উচ্ছাসে ইমোজির বন্যা বইছিলো টেক্সটে । তার দু-ঘন্টা পরে জিয়া-কে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় । জিয়ার মা, অভিনেত্রী রাবিয়া আমিন, রাত ১১-২০ নাগাদ অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে অতিরিক্ত বেড রুমে জিয়াকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেন । শরীরে তখনও যথেষ্ট উষ্ণতা ছিল । কবিতা যখন ফ্লাইট থেকে মুম্বই এয়ারপোর্টে নামলেন তখন তাঁর ফোন অজস্র শোকজ্ঞাপনে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম । এবার ভাবুন, কেন এমন হয় ? কোন যুক্তিতে হয় ! স্যুইসাইড নোট পাওয়া যায় নি, উলটে ন-মাসের প্রেমিক সুরয পাঞ্চোলির উদ্দেশ্যে লেখা দীর্ঘ চিঠি পাওয়া গেল । খুন না আত্মহত্যা — অমীমাংসিত । আমাদের এই প্রতিবেদন সে রহস্যের সমাধানসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে না । শুধু বলতে চাইছে, এমন ঘটনা ঘটে । 

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ চরিত্রে সুশান্ত সিংহ রাজপুত

বাস্তবিকই আমরা জানি না, কে জীবনে কতটা কষ্টে আছে, অভিনেতাদের জীবনে খ্যাতি  অজস্র বিড়ম্বনা ও আবর্ত নিয়ে আসে, ব্যর্থতা ভুল করায় … রবিন উইলিয়ামসের মতো মানুষও তাই আমাদের হতচকিত করে দিয়ে আচমকা চলে যান । তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই …. শুধু অদ্ভুত লাগছে দিগন্ত পত্রিকার ব্লগে আমার শেষ লেখাটায় এমনই একটি মৃত্যুু নিয়ে বোনা একটি গল্প তথা সিনেমার আলোচনা করেছিলাম । হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, ‘মাবোরোসি’-তে এমনই একটি ব্যাখ্যাহীন মৃত্যুু ছিল । ভাবিনি দু দিন পর সিনেমা দখল নেবে জীবনের রঙ্গমঞ্চের । জীবনের নিরর্থকতা নিয়ে তাই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো ব্যক্তিত্ব (যিনি দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিকতা দেখেছেন ও  আত্মহননে জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন) এরকম লিখতেই পারেন, –

If my Valentine you won’t be,I’ll hang myself on your Christmas tree.” আসলে আশা ফুরাইলেই সকলি ফুরাইল । যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন সুশান্ত, আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি ।

Facebook Comments

You Might Also Like