চলচ্চিত্র বিনোদন

এবার থেকে নতুন ট্রেন্ড, নতুন বছরে নতুন শঙ্কুর জন্য অপেক্ষা

পরিচালক সন্দীপ রায় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন , বড়দিনে বাঙালিকে উপহার দিলেন শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার । প্রফেসর শঙ্কু ও এলডোরাডো। নির্দেশক ও দর্শক উভয়ের দিক থেকে বহু দিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তিনি এলেন স্বপ্ন ও প্রত্যাশায় টইটুম্বুর হয়ে । ঠিক কত দিনের পরিকল্পনা ও অধ্যাবসায়ের ফসল এই ছবি ? বলা মুশকিল কারণ , স্রষ্ঠা স্বয়ং নির্মাণ করতে আগ্রহী ছিলেন বলে শোনা যায় । কিন্তু প্রযুক্তির অভাবে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি । তাহলে গোড়া থেকে ধরলে কত দিন ? কত বছর ? ঠিক মত বললে কয় দশক ? থাক সে কথা । শঙ্কুকে যে রূপে আবির্ভূত হতে দেখা গেল তাতে অপ্রাপ্তি কিছুই থাকে না । এই রক্ত মাংসের মানুষটি অনেক বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তব সম্মত । সাহিত্য পাঠের যে উপযোগিতা অর্থাৎ পাঠকের নিজস্ব কল্পনার বিস্তার ঘটার সুযোগ তা যে রুপোলি পর্দায় থাকবে না এতো বহু চর্চিত থিওরি । এবং এটাও জোর গলায় বলা চলে সত্যজিতের গুণমুগ্ধ সমস্ত বাঙালি পাঠকের কাছে শঙ্কুর সব কাহিনী প্রায় ঠোঁটস্থ । তাহলেই বোঝা যায় চ্যালেঞ্জটা কতখানি কঠিন । আর সেখানেই পরিচালকের মুন্সিয়ানা । মন ভরানো প্রাণ জুড়ানো আমোদিত আহ্লাদিত আনন্দঘন একটি চলচ্চিত্র তিনি উপহার দিয়েছেন ।

আরও পড়ুন >> ধৃতিমান নয়, শঙ্কু হিসেবে সন্দীপ রায়ের প্রথম পছন্দ ছিলেন ইনি

ব্যোমযাত্রীর ডায়রি দিয়ে শুরু করেছেন সন্দীপ । তারক চ্যাটার্জির আগমন এবং তার সুন্দরবনে উল্কাপাতের অকুস্থলে হাজির হওয়ার ভিস্যুয়াল প্ৰথমেই রহস্যের আস্বাদন করায় । পিঠ টান করে বসতে হয় যখন চোখের সামনে ডায়রির পাতায় হাতের লেখা কলির রং পাল্টে যায় অনর্গল । এই হল শুরু যে চমক বজায় থাকে শেষ পর্যন্ত । রিয়েল লোকেশন শ্যুটিং ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মিশেল ঘটিয়ে সন্দীপ তৈরী করেছেন আদ্যন্ত স্মার্ট ঝকঝকে নয়নাভিরাম একটি ছবি যা মুগ্ধ করে সব বয়সের দর্শকদের । তবে লক্ষ্যণীয় ও সর্বাধিক গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় হল এই যে কোথাও কিন্তু স্পেশাল এফেক্টস এর বাড়াবাড়ি কি দাপাদাপি নেই , সহজ সাবলীল , যতটুকু প্রয়োজন । ব্রাজিলের অংশে ইংরেজি সংলাপ যথেষ্ট সহজপাচ্য সঙ্গে সাব টাইটেল রয়েছে । ফলে গল্পের রসাস্বাদন করতে কোনো অসুবিধা নেই । 


অভিনয়ে ধৃতিমান ও শুভাশিস জুটি অনবদ্য । শুধু লিখিত বর্ণনাই নয় যেনো ইলাস্ট্রেশনের সঙ্গে মিলিয়ে বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা দুটি মানুষ যারা কাল্পনিক চরিত্র নয় । একজন বহু পরিচিত সেলিব্রিটি ও অন্যজন হঠাৎ আলোকবৃত্তে এসে পড়া কমন ম্যান । শুরু থেকেই মনে হয় যেন ট্রাভেলগ ডকুমেন্টরি । ওদিকে ভিনদেশিদের মধ্যে সন্ডার্স চরিত্রে রিকার্ডো ও ক্রোল চরিত্রে রনি মানানসই , বাহুল্য বর্জিত । সলোমন ব্লুম গার্টেন তার বিশাল বপু লম্বা চুল দাড়ি নিয়ে অর্ধেক বাজী মাত করে দেয় । অভিনয় একটু চড়া দাগের হলেও মাত্রাতিরিক্ত নয় বরং বেশ উপভোগ্য । বাকী চরিত্রাভিনেতাদের ঠিকঠাক বলাই যায় । তবে বেশ কিছুটা আড়ষ্ঠতা নিয়ে পর্দায় ধরা পড়ে লোবো চরিত্রের অভিনেতা যাকিনা ক্লাইম্যাক্স অংশকে দুর্বল করে দেয় । আসলে যে ধরনের মূল্য বোধের সংস্কৃতির চর্চা বাংলা সাহিত্যের পাতায় বিধৃত আছে সেটি অনুধাবন করা আজকের যুগের কোনো পর্তুগিজ ব্যক্তি যে দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দা তার পক্ষে উপলব্ধি করা বোধ হয় অসম্ভব । তাই অনুতাপে জর্জরিত হওয়ার সময়ের অভিনয় বেমানান লাগে । 


CG & VFX সত্যিই অনবদ্য , নিখুঁত মাপজোক প্রায় বাস্তবকে ছুঁয়ে যাওয়ার কাছে পৌঁছে যায় । এতো বিচিত্র দৃশ্যাবলীর সমাহার ঘটে যে চোখ ব্যস্ত হয়ে পড়ে সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে কিন্তু রঙের টোন কখনো নিজস্বতা হারায় না । পরিশেষে বলতে হবে একথা অনস্বীকার্য যে এই ছবিকে বিশ্বমানের করে তোলার পিছনে প্রধান স্থপতি হলেন তিনজন , চিত্র গ্রাহক সৌমিক হালদার , সম্পাদক সুব্রত রায় ও সাউন্ড ডিজাইনার অনুপ মুখার্জী । অসামান্য দক্ষতায় নির্মেদ সিনেমা তৈরীর সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবিদার এই ত্রয়ী । 
এবার থেকে নতুন ট্রেন্ড , নতুন বছরে নতুন শঙ্কুর জন্য অপেক্ষা । চলচ্চিত্র প্রেমী বাঙালি দর্শক আশাবাদী হতেই পারে ।  

Facebook Comments

You Might Also Like