চলচ্চিত্র বিনোদন

ধৃতিমান নয়, শঙ্কু হিসেবে সন্দীপ রায়ের প্রথম পছন্দ ছিলেন ইনি

একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার স্মৃতিচারণ করে শুরু করা যাক । সেটা ২০১৩ সালের কথা, আমি তখন রাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ সংযোগ ও ভিডিওগ্রাফি বিভাগে আংশিক সময়ের  শিক্ষকতার কাজে যুক্ত । আমার বিষয় হল তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রশিক্ষণ দেওয়া । ঐ ব্যাচের একটি গ্রুপের ছাত্র ছাত্রীরা তাদের প্রজেক্টের বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি গোয়েন্দা ফেলুদার কাহিনী ও তার বিশ্লেষণ ভিত্তিক ডকুমেন্টারি । এই ব্যাপারে বৈতরণী পার হতে তারা আমাকে কান্ডারী হওয়ার জন্য জম্পেশ করে ধরে বসল । সেটাকে অনুরোধ না বলে একপ্রকার উৎপীড়ন বললে ভুল হবে না । আমারও অসম্মত হওয়ার কথা নয় কারণ তথ্যচিত্রের বিষয়টি যে আমার সাংঘাতিক প্রিয় ও বিশেষ দুর্বলতার জায়গাও বটে । বলা বাহুল্য এই কাজ করতে গেলে বাবুদার (সন্দীপ রায়) সাক্ষাৎকার নেওয়া অনিবার্য । একদিন বিকেলে সদলবলে হাজির হলাম বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে । কালো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই সেই ড্রয়িং রুম, সামনে সেই জগৎ বিখ্যাত লাল গদির চেয়ার । স্টুডেন্টরা বেশ শিহরণ অনুভব করছে বলে জানালো । অল্প সময়ের মধ্যেই বাবুদা এলেন ও যথারীতি সময়াভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন । চটপট কাজ সারতে হবে , ভিডিও ক্যামেরার রেকর্ডিং বটন প্রেস করে প্রশ্ন করা শুরু হল এবং এক সময় তা শেষও হল । কিন্তু যখন যে আমি ও বাবুদা নিজেদের অজান্তে প্রসঙ্গান্তরে চলে যাই তার হুঁশ ছিল না । সিনেমা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে কথা হতে থাকে , অবশেষে এলো শঙ্কু চলচ্চিত্রায়নের প্রসঙ্গ ।

আমি বললাম গল্পে বর্ণিত গিরিডি শহর ও ঊশ্রী নদীর ধার এই সব কি আর আগের মতো আছে ! শ্যুটিং হবে কোথায়? উত্তরে উনি বললেন : নানা ও নিয়ে আমি চিন্তিত নই, হুবহু সেই জায়গাতেই যে শ্যুট করতে হবে এমন তো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই । বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায় এমন একটা লোকেল পেলেই হল।

আরও পড়ুন >> এবার থেকে নতুন ট্রেন্ড, নতুন বছরে নতুন শঙ্কুর জন্য অপেক্ষা

আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল : শঙ্কুর গল্প স্পেশাল এফেক্টস ছাড়া তৈরী করা অসম্ভব , এ ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন ? বাবুদার উত্তর : CG এবং VFX এখন অনেক উন্নত হয়েছে । এমন টেকনোলজি এখন সহজলভ্য যে এখানে বসেই শঙ্কু কাহিনী নিয়ে ছবি তৈরীতে হাত দেওয়া যায় । আসল চিন্তার কথা হল শঙ্কু চরিত্রে অভিনয় করবেন কে ? এই কথা বলে বাবুদা যেন আত্মমগ্ন হয়ে গেলেন । বেশ গভীর চিন্তায় ডুব দিয়েছেন । আমি বললাম ভেবেছেন কারোর কথা ? অ্যাঁ কি !  ওহ্ হ্যাঁ । হঠাৎ যেনো সম্বিৎ ফিরে পেলেন । এবার আমাকে দারুন অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন করলেন আচ্ছা তুমি বলতো শঙ্কু চরিত্রে তুমি কাকে দেখতে চাও ? কাকে সব চাইতে মানান সই হবে বলে তোমার মনে হচ্ছে ? এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে আমি যে যথেষ্ট ঘাবড়ে গিয়েছিলাম তা স্বীকার করতে কোন বাধা নেই । একটু ভেবে বললাম যিনি অভিনয় করলে দি বেষ্ট হতো দুঃখের কথা তিনি আজ আর নেই। বাবুদা : কে কার কথা বলছ ? আমি : উৎপল দত্ত । বাবুদা : ওহ্ মাই গড । নাথিং লাইক ইট । হি ওয়াজ সিম্পলি জিনিয়াস । যাক সে কথা আর ভেবে লাভ কি ! এখন কাকে পছন্দ তাই বলো । আমি : ভিক্টর ব্যানার্জি । বাবুদা : হোয়াই ? গিভ রিজন ? আমি : চরিত্রের সঙ্গে চেহারা সম্পূর্ণ মানানসই । এক সময় হিরো করেছেন , ওয়াইড এক্সেপ্টেন্স । ইংরেজিতে সাবলীল এবং আন্তর্জাতিক ছবিতে কাজের অভিজ্ঞ্যতা রয়েছে । বাবু দা : হুম্ বুঝলাম । আচ্ছা ধৃতিমান চ্যাটার্জি হলে কেমন হয় ? আমি আরেক দফা বিস্মিত হলাম ! বললাম উনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেগেটিভ চরিত্র কিম্বা রাগী যুবক ও আরো পরে রাগী বৃদ্ধ ইত্যাদি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেটা একটা অন্তরায়ের কারণ হতে পারে । বাবুদা : অর্থাৎ ? প্লিজ এক্সপ্লেন ।  আমি : দেখুন শঙ্কু মূলত শিশু সাহিত্যের চরিত্র , ঠিক করে বলতে গেলে পাঠক হল ইয়াং অ্যাডাল্ট এবং ধরা যেতেই পারে ছবি হলে সংখ্যা গরিষ্ঠ দর্শক তারাই হবে । সেক্ষেত্রে ওনার ওই রাগী ও রাশভারী ইমেজের কারণে সেই সব দর্শকরা ভয় পেয়ে যাবে না তো ? বাবুদা : আমি কিন্তু শঙ্কুকে মোটেই পাগলাটে অথবা খ্যাপাটে বিজ্ঞানী করে তুলতে চাই না । আমার কাছে সে যথেষ্ট স্মার্ট আপ  রাইট শার্প অ্যান্ড ফুল অফ্ সেন্স অফ হিউমার একটি ক্যারেকটার । 

সেদিন পনের মিনিট কথা বলার অনুমতি নিয়ে শুরু করে সোয়া ঘন্টা পার করে উঠেছিলাম। আলোচনা বহু দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল । মাঝে সাত বছর কেটে গেছে , ২০১৯ এর শেষ প্রান্তে এসে দেখলাম জলজ্যান্ত প্রফেসর শঙ্কু কমিক স্ট্রিপের পাতা থেকে উঠে সশরীরে পর্দায় উপস্থিত হয়েছেন ।  


Facebook Comments

You Might Also Like