চলচ্চিত্র বিনোদন

মৃণাল সেনের সিনেমায় শহর কলকাতা-পৃথ্বী সেনগুপ্ত (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রথম পর্বের কথা…..আমাদের চিন্তাভাবনা-মানসিকতা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগের মধ্যে যে একটা দ্বন্দ্ধ রয়েছে তার সূক্ষ্ম আভাস পাওয়া যায়, ‘নীল আকাশের নীচে’ চলচ্চিত্রটির মধ্য দিয়ে ৷ মৃণাল সেনের পরবর্তী চলচ্চিত্রে ঘটনা হয়ত পাল্টেছে ৷ কিন্ত‍ু কলকাতা শহরের প্রেক্ষাপটে সেই মূল দ্বন্দ্ধকে-ই আমরা দেখতে পেয়েছি আরো সরাসরি ও প্রবলভাবে ৷………….

পরবর্তী তিনটি সিনেমা, ‘পুনশ্চ’, ‘অবশেষে’ এবং ‘প্রতিনিধি’-র কেন্দ্রীয় বিষয় অনেকটা একই বৃত্তের মধ্যে আবর্ত (মুক্তির সময়কালের ব্যবধানও খুব কম-১৯৬১ থেকে ১৯৬৪) ৷ সমাজের দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা সামাজিক সমস্যা-সম্পর্কের টানাপোড়েন-অর্থনৈতিক সংকট- আমাদের সমাজে পুরুষ ও নারীর অবস্হান-মূলত এই বিষয়গুলিকেই পরিচালক গুরুত্ব দিয়ে ধরতে চেয়েছেন ৷ যা আরো যথার্থ্যভাবে ফুটে উঠল ‘আকাশ কুসুম’-এ ৷ যার রুপ-বর্ণ-গন্ধ সবই কলকাতার ৷

মধ্যবিত্ত বাঙালী জীবনের আশা-আকাঙ্খা, (বা বলা যায় অবাস্তব উচাকাঙ্খা) ভালোবাসা, স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী নিয়ে গড়ে ওঠা ‘আকাশ কুসুম’-এ কলকাতার বহু জায়গার দৃশ্য ছাড়াও রয়েছে স্কাইলাইন, টপ ভিউ শট ৷ বৃষ্টিভেজা জলবন্দি শহরের রুপ অসামান্যভাবেই ফুটে উঠেছে ফ্রিজ বা স্হির চিত্রের কোলাজ এবং ধ্বনি সহযোগে ৷ আবার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে যথোপযুক্ত সংলাপ ৷ যেমন নায়ক তার বন্ধুকে আর্থিক লাভের প্রসঙ্গে উচাকাঙ্খায় বলছে-“কলকাতা শহরটাকে কিনে নেব…..”৷ আবার ভালোবাসার আমেজকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছে গঙ্গার পাড় কিংবা সন্ধ্যের রাজপথের ছবি ৷ রোমান্টিকতার সাথে মূল চরিত্রের অবাস্তব কল্পনা, মিথ্যে আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি, এই স্নায়বিক চাপের মাঝখানে খানিকটা যেন রিলিফের মতো অক্সিজেন যুগিয়েছে এই শহরের দৃশ্যাবলীগুলি ৷ নায়ক-নায়িকা, দুটি আর্থ-সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্হানকারী চরিত্রের হৃদয়ের যোগসূত্র গড়ে তোলে এই শহর ৷ সময় যত এগিয়েছে সমাজের নানা দিকের উপস্হাপনা নানাভাবে ঘনীভূত হয়ে দেখা দিয়েছে পরিচালকের পরবর্তী আরো চলচ্চিত্রেও ৷

পরিচালকের কলকাতা-ত্রয়ী প্রসঙ্গে যে নামগুলি আমাদের মনে পড়ে তা হলো ‘ইন্টারভিউ’, পরে ‘কলকাতা ৭১’ ও ‘পদাতিক’ ৷ ১৯৪৭ থেকে ‘ইন্টারভিউ’ মুক্তির সময় ১৯৭০ সাল এক দীর্ঘ সময় ৷ দেশ স্বাধীন হলেও মানসিকতায় আমরা তখনো যে পরাধীন অবস্হাতেই রয়েছি তাই যেন পরিচালক আমাদেরকে বারবার দেখাতে চেয়েছেন ৷ সদ্য পাওয়া স্বাধীনতার অনুভূতি উপলব্দ্ধি করা যায় শহরের রাজপথ থেকে বিদেশী শাসকের মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে ৷  আবার এ শহরের টপ-ভিউ শট ছাড়াও আরো এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যা বাঙালী সংস্কৃতির নিজস্ব স্বতন্ত্র সত্ত্বাকে খুব জোরালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে ৷ যেমন-চলমান শটের সাহায্যে শহরের গলি ও আশেপাশের বাড়ি-ঘরের দৃশ্য, সকালে উনুন ধরানো, ছাদে কাপড় মেলা ও আশেপাশের লোকালয়ের দৃশ্য, সকালে শহরে দুধের গাড়ি আসা ও মানুষের তা সংগ্রহের ব্যস্ততা ৷ কিংবা আরো বলা যায় মাছের বাজারের দৃশ্যের কথাও (এই মাছের বাজারের দৃশ্যের আরো সুন্দর উপস্হাপনা আমরা পরে ‘চালচিত্র’-ও দেখে থাকি) ৷ যেখানে নায়ক চাকরির জন্য তার পরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা বলেন এবং প্রসঙ্গক্রমে সেই চরিত্র জানান, ইতিমধ্যেই অন্য মাছ বিক্রেতার সাথে বাক্-বিতণ্ডা হওয়ায় তিনি এই বাজারে এসেছেন ৷ দৃশ্যটি আমাদের রোজকার জীবনের, সকালের ব্যস্ততায় কম দামে কত ভালো জিনিস পেলাম-এই গর্ববোধের অনুভূতিকেই যেন মনে করায় ৷ অনুভূতির রেশ রয়ে যায়, মানুষের বাসের হাতল ধরা অসংখ্য হাতের নিউট্র্যাল শটে; বসে থাকা মহিলা যাত্রীর সাময়িকীর পাতা উল্টানো এবং সাধারণ যাত্রী হিসেবে পাশে দাড়িয়ে থাকা নায়কের ছবি সেখানে প্রকাশিত হওয়ায় তার বিস্ময় প্রকাশ, নায়কের সাথে জনৈক বাসযাত্রীরও সাধারণ জীবন ও জীবিকা সর্ম্পকিত মিল খুঁজে পাওয়ার মধ্যে ৷ সামগ্রিক এই সূত্রে আমরাও যেন কখন হয়ে উঠি সেই একই পথের যাত্রী ৷ বাসের প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় পকেটমারির, শহরের রাস্তা দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং থানায় অভিযোগ নথিভুক্ত করানোর দৃশ্যটির কথাও ৷ ‘ইন্টারভিউ’ চলচ্চিত্রটি এক অর্থে যেন কলকাতা শহরের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র বিশেষই ৷ বাসের ধোঁয়া ছাড়া, ভিড়ে বসে থাকা ক্লান্ত যাত্রীর দৃশ্য-যাত্রীদের অনবরত উঠানামা, শহরের রাজপথ ও যানবাহনের ব্যস্ততার নিউট্র্যাল শট, পুরোনো দোকানের দ্রুতগতির কোলাজ-দৃশ্য, অসংখ্য মানুষের প্রত্যহ জীবন-জীবিকার জন্য সংগ্রাম, ভিড়ে ব্যস্ত শহরের টপ-ভিউ শট-প্রভৃতি যেভাবে নানারকম দৃশ্যের সাহায্যে শহরের প্রাণকে গতিশীলতার মধ্য দিয়ে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, তা আজকের সময়েও দাঁড়িয়েও যেন ভীষণভাবেই প্রাসঙ্গিক ৷ এক্ষেত্রে আরো উল্লেখ্য বিষয় হলো, সাধারণ দর্শক হিসেবে সিনেমাটি আমাদের কাছে যেন পুরোনো কলকাতার সময়ের একটি দলিল বিশেষ ৷ কারণ, অত্যন্ত বিস্তৃতভাবেই আমরা যে শহরকে বাহ্যিকভাবে এখানে দেখি, তার সাথে স্বাভাবিকভাবেই শুধু এই সময়েরই নয়, পরিচালকের পরবর্তী চিত্রায়ণে ধরা দেওয়ার মধ্যেও অনেক তফাত রয়েছে ৷ সাদা-কালো এই সিনেমায় শহরের নানান স্হাপত্যরীতির পুরনো বাড়ি, রাস্তা-যানবাহন-মানুষের ভিড় দেখতে-দেখতে কখন যেন আমারা ফিরে যাই অতীতে ৷ আবার পরমুহূর্তে অশান্ত শহরের রাজপথ-বিক্ষোভ-মিছিল-ধর্মঘট, দোকান বন্ধ করে দেওয়ার দৃশ্য-আমাদেরকে এনে ফেলে একটা দ্বান্দিক-Transition-র জায়গায় ৷ যে দ্বন্দ্ব সবসয়েই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে কাজ করে চলেছে, বিপরীত শক্তি হিসেবে ৷ তাই আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী বিন্যাসের স্তর থেকে উত্তরণের চেষ্টাও হয়ে চলেছে সবসময়েই ৷ যেমন-বাঙালী পোশাকে বাঙালী নায়ককে মানালেও চাকরি পাওয়ার ও সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য দরকার বিলিতি পোশাকের, যা পারিপার্শ্বিক নানান কাজের অস্হিরতায় তিনি সংগ্রহ করে উঠতে পারেননি ৷ টেলিফোনের সাহায্যে তিনি তা সংগ্রহ করতে গিয়ে যান্ত্রিক গোলোযোগের জন্য, অন্য প্রান্তের কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া অচেনা মানুষের কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন ৷ তার গুরুত্ব বোঝাতেও ব্যর্থ অনুরোধ করেছেন ৷ একই শহরে বসবাসকারী মানুষের মানসিকতার মধ্যে এই যে সংঘাতের স্ফুরণ এখানে দেখা গেছিল, তার রেশ রয়ে গেছে পরেও ৷ আবার ‘কলকাতা ৭১’-এ, কলকাতাই ছবির আত্মাস্বরুপ । কেননা এ ছবিতে রয়েছে শহরের বিভিন্ন দৃশ্যের কোলাজ ৷ ছবির শুরুতেই রয়েছে হাওড়া ব্রিজের শট ৷ রয়েছে ঘোড়দৌড়, রাতের প্রতিমা বিসর্জন, জনমানব শূন্য রাস্তাঘাট, খেলার মাঠের ফাঁকা গ্যালারীর দৃশ্য ৷ পরিচালকের অন্যান্য চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও আমরা কলকাতা শহরকে এইরকমভাবেই দৃশ্যের সাহায্যে ধারণা সৃষ্টিকারী বিষয় হিসেবে উপস্হাপিত হতে দেখে থাকি ৷ তবে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে হয়, ‘কলকাতা ৭১’-এ শহরের দুর্ভিক্ষের দৃশ্যগুলির কথা ৷ যা এই চলচ্চিত্রের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ৷ আমাদেরকে ভাবায় ‘কলকাতা ৭১’-র একাধিক টুকরো-টুকরো গল্পগুলির মধ্যে যোগসূত্র কোথায় ৷ পরিচালকের বক্তব্য অনুসারে, “আমাদের ইতিহাসে বাস্তবের তুলনায় রোমান্টিকতা বেশী ৷ তাই ইতিহাস বুঝলে ‘কলকাতা ৭১’-র চিত্রগুলিও পরিস্কার হয়ে উঠবে৷”(বই:‘সমাজ এবং চলচ্চিত্র’-মৃণাল সেন) ৷

————————————————————————————————–

বাংলা চলচ্চিত্রের আরো কিছু কথা………………অপুত্রয়ী

অপুত্রয়ী – পৃথ্বী সেনগুপ্ত

————————————————————————

‘পদাতিক’ চলচ্চিত্রটির রাজনৈতিক বক্তব্যের গভীরতা আর তার ব্যাপকতা অনেক বেশী এবং কলকাতার প্রেক্ষাপটেই পুরোপুরিভাবেই একটি নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে তা নির্মিত ৷ পুলিশের হেফাজত থেকে পালানো রাজনৈতিক দলের একটি ছেলে আশ্রয় নেয় বিছিন্ন বিবাহিতা এক পাঞ্জাবী মহিলার বাড়িতে ৷ এই বিচ্ছিন্ন পরিবেশে সে উপলব্দ্ধি করে তার আন্দোলনের পথ তাকে যেন দূরে সরিয়ে দিচ্ছে তার পরিবার-সমাজ-দল সবকিছু থেকেই ৷ এর বিরুদ্ধে এগোতে হবে সাধারণ মানুষকে একত্রিত করেই ৷ অপরদিকে সেই অবাঙালী মহিলা কাজ করেন একটি বিজ্ঞাপন সংস্হায় ৷ পুরুষশাষিত সমাজে তিনি লড়াই করছেন নিজের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে ৷ তার বিজ্ঞাপন তৈরীতে ব্যবহৃত হয়েছে দুর্ভিক্ষ-এর দৃশ্য ৷ নিজের ভাইয়ের লড়াইয়ের সাথে, তার বাড়িতে আশ্রিত ব্যক্তির লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছে নিজের ভালোলাগার পরিসর ৷ চলচ্চিত্রে সংলাপ এবং দৃশ্যের মাধ্যমে বলিষ্ঠ বক্তব্য প্রকাশের সুর, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকটাই উঁচুতে বাধা ৷ শহরের দেওয়াল লিখনের দৃশ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মসূচীর কথা বলা, কাঁপা-কাঁপা শটের অসংখ্য ব্যবহার যেন সেই সময়ের সংগ্রাম-অস্হিরতা-দোলাচলের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয় ৷ আবার দুই প্রজন্মের মধ্যে আদর্শের দ্বন্দ্ধ, মূল্যবোধের সাথে আপোসের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া–এই বিষয়গুলি আমাদের চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে গভীরভাবে রেখাপাত করে, যখন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের পিতা শহরের রাজপথ দিয়ে হেটেঁ চলেন কিংবা বৃদ্ধ বয়সে ভিড় বাসে ওঠার প্রচেষ্টা, অন্যান্য চরিত্রের গলি থেকে রাজপথে হেঁটে চলার কিংবা আত্মরক্ষার জন্য ছুটে পালানোর দৃশ্যগুলি আমরা দেখে থাকি ৷ কলকাতা এ ছবির শুধু একটি সময়ের ব্যতিক্রমী বহিঃপ্রকাশের উদাহরণ বিশেষ নয়, নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশের তাগিদে একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রও বটে ৷

‘কোরাস’ ছবিতে ফর্ম বা ছাঁচ ভেঙে যে নতুনত্ব আমরা দেখেছিলাম, সেখানেও ঘুরে ফিরে এসেছে শহর কলকাতা ৷ চাকরী, শিক্ষা, বেকারত্ব, আর্থিক অনটন, সামাজিক প্রভেদ প্রভৃতি সমস্যার বিষয়গুলি শহরের রাজপথ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের প্রান্তরে । রাজপথে সাংবাদিকের ১০০ টি পদের জন্য ৩০,০০০ চাকরীপ্রার্থীর লিফলেটের সংখ্যার ছবি ফ্রেমবন্দি করার দৃশ্য বা সাধারণ পথচারী-ফুটপাথবাসীর তা কৌতুকের সাথে, উৎসাহের সাথে দেখার দৃশ্য এইক্ষেত্রে সমগ্র চলচ্চিত্রের আঙ্গিকে আমাদেরকেও বার-বার ভাবতে বাধ্য করে, বিষয়টির আজকের তাৎপর্য্য কোথায় বা কতটা ৷ রাজপথে ৩০,০০০ সংখ্যার দৃশ্যটি তাই শুধু একটি সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, শহর থেকে তা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে ৷ স্বয়ং পরিচালক ‘আমি এবং চলচ্চিত্র’ এই বইতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “…. মোটামুটি সমস্ত কিছু জড়িয়ে আমরা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক চেহারা কলকাতা দিয়ে শুরু করে–যে কলকাতার মধ্যে গোটা ভারতবর্ষকেই খুজে পাওয়া যায়–তারই পরিপ্রেক্ষিতে তার সামাজিক চেহারা, তার নানা রকম উঠতি পড়তি, তার বিভিন্ন conflicting force-এর কথা বলতে চেষ্টা করেছি।” কলকাতা শহরের দৃশ্যের প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করতে হয়, বাসে করে যাওয়ার সময় বেতার (বা রেডিও) যন্ত্রটি কানে দিয়ে খবর শোনার বাস্তবিক উদাহরণের কথা । আজকের ব্যস্ততম দ্রুতগতির হাতের মুঠোয় প্রযুক্তি-সর্বস্ব যুগে যা বিরলই নয়, আগামী প্রজন্মের কাছে এই দৃশ্য হয়তো বিস্ময়করও ৷

‘মৃগয়া’ এবং ‘ওকা উরি কথা’-দু’টি চলচ্চিত্রে কলকাতা অনুপস্হিত ৷ কিন্তু পরিচালকের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত মানুষের, একেবারে গরীব মানুষের জীবনের কাছাকাছি যাওয়ার, থাকার চেষ্টা বজায় রইলো ‘পরশুরাম’-ও, নিম্নবিত্ত ঝুপড়িবাসী, উদ্বাস্তু মানুষের মধ্য দিয়ে ৷ চলচ্চিত্রের বক্তব্যে স্যাটায়ার-র মাত্রার সাথে পাল্টালো স্হান ৷ কলকাতাকে ফিরে পেলাম একটু অন্যরকমভাবে ৷ শহরের সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি আরেক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে, যাদের জীবনেও রয়েছে কিছু আশা-আঙ্কাখা ৷ আছে তাদের নিজস্ব জীবন-সংগ্রামও ৷ যাদের দিকে তাকিয়ে-ও আমরা চোখ বুজে থাকি–এইসব মানুষের প্রতিনিধিই হিসেবে দেখানো হয় পরশুরাম চরিত্রটিকে ৷ উদ্বাস্ত‍ু সমস্যা এ চলচ্চিত্রের মূল বিষয় ৷ কিন্ত‍ু তার থেকে-ও অনেকসময় বড় হয়ে ওঠে মানবিকতার দিকটি ৷ কলকাতা শহরের দৃশ্য তাই এই চলচ্চিত্রে এসেছে ভীষণ ব্যঞ্জনাময়ভাবে, ভিন্ন-ভিন্ন মাত্রায় । যেমন বলা যায়–রেল লাইনের পাশে পরিত্যক্ত বাড়িতে গরীব মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা এবং তাদের জীবন-যাপনের চিত্র, রাজপথ এবং উঁচু উঁচু বাড়ির সাথে সাথেই এসেছে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনের সাথে গণ্ডগোলের ছবি ৷ পেটের যুদ্ধের সাথে মনের যুদ্ধে খেটে উপার্জন করার, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস বেঁচে উপার্জন করার কিংবা ভিক্ষে করে বেঁচে থাকার প্রয়াসের দৃশ্য ৷ একদিকে শহরে গড়ে উঠছে সুউচ্চ বড়-বড় ইমারত, আবার অপরদিকে ঝুপড়ির মধ্যে প্রসব বেদনার দৃ্শ্য যেন আমাদেরকে ভীষণভাবেই আঘাত করে ৷ বাঁশের মাথায় উঠে খেলা দেখানোর মধ্য দিয়ে শহরের সামগ্রিক অবস্হা বর্ণন, রাজপথে পরশুরামের বক্সিং-এর মুষ্টিচালনার অভ্যাস করার কৌশল রপ্ত করা, ঘাটে বাবুদের ছুঁড়ে দেওয়া সাহায্য কুড়োনো প্রসঙ্গে জীবন সংগ্রাম এবং ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে সীমা নির্ধারণ-আমাদের মনে করায় বেঁচে থাকার প্রসঙ্গে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা এবং তার পরিবর্তনের দিকগুলিকে ৷ আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় একটা শহরে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের মানুষ, রয়েছে তাদের স্বতন্ত্র পৃথিবী, রয়েছে সমস্যা ৷ পরশুরামের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্হার মধ্য দিয়ে তার কাছের লোকজনের মধ্যে একতা-ভালোবাসা, ছবির শেষ দৃশ্যে “জয় হোক” বলার সাথে সাথে রেলগাড়ীর আওয়াজ যেন তাই চলমান সময়কে তুলে ধরে ৷ এর পরবর্তী সময়ে নির্মিত ‘একদিন প্রতিদিন’ চলচ্চিত্রটি আবার ভিন্ন ধাঁচের ৷

উত্তর কলকাতার সংকীর্ণ গলির দৃশ্য, কল থেকে জল খাওয়া, রাস্তায় খেলার দৃশ্য-হাতে টানা রিকশা, পুরোনো সাবেকি ধাঁচের বাড়িতে একাধিক পরিবারের ভাড়া দিয়ে বসবাস-প্রভৃতি সবকিছু-ই মনে করিয়ে দেয় বনেদীয়ানার সাথে এই সময়ের দ্বন্দ্ধকে ৷ যা আরো ফুটে ওঠে গলিকে শৌচালয় হিসেবে ব্যবহার কিংবা বাড়িওয়ালার ‘এটা তো ভদ্রলোকের বাড়ি’-র মতো মনোভাব তথা সংলাপে ৷ রয়েছে ভিড়ে ঠাসা দ্বি-তল বাসের এবং রাতের শহরের ট্রামের দৃশ্য ৷ এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক নারীর দশটা-পাঁচটার অফিসে যাওয়া, পুরো পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব কাঁধে টানাকে ভিত্তি করে নির্মিত; হঠাৎ-ই একদিন তার অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে দেরী হওয়ায় নিজ পরিবার এবং আশেপাশের মানুষজনের, তার চরিত্র নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা ৷ আমরা দেখতে পাই, প্রত্যেকের স্বতন্ত্র নিজস্ব চেহারাগুলিকে ৷ নানা প্রসঙ্গে তখন কলকাতার নানা ঘটনা, দুর্ঘটনার কথা আলোচনা করা, শহরের নারী সমাজের সম্বন্ধে একটা সরলীকরণ মতামত দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা শহরের সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্হা সম্বন্ধেও অবহিত হয় ৷ মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের অতীতের সাথে নতুন পরিবর্তিত সময়ের তাল মেলাতে না পারার দ্বন্দ্ধ, একইসাথে জীবনের ও সময়ের গতিশীলতা-এই দুইয়ের সমান্তরাল ধারা সামগ্রিক অর্থে প্রতিষ্ঠিত করে যে কলকাতাকে, তা যেন দেখানো হয় ছবির শেষ দৃশ্যে-শহরের একটি নিউট্র্যাল শট এবং সকালের রোজকার উনুন ধরানোর দৃশ্যটির মধ্য দিয়ে ৷

(চলবে)


mrinal sen kolkata 2

 

পড়ুন >> তৃতীয় পর্ব >>

 

অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়া কালচারের নানান দিক….>>>>>

মাধ্যম-সংস্কৃতির পরিমণ্ডল এবং আমরা – পৃথ্বী সেনগুপ্ত

 

Facebook Comments

You Might Also Like