চলচ্চিত্র বিনোদন

ছপক মুভির এক হপ্তা, রাজনীতি ছেড়ে সত্যিটা জানুন

তবেরে তোর এতো অহংকার ! এতো সাহস আমায় করিস অবজ্ঞা ! দাঁড়া তোর দেখাচ্ছি মজা : ছপাক । পরিচালক মেঘনা গুলজার তাঁর সাম্প্রতিক তম হিন্দি ছবি ছপাক নিয়ে হাজির হয়েছেন দর্শকদের সামনে আর উস্কে দিয়েছেন এমন কিছু প্রশ্ন যা আমাদের আপাত নিরীহ শান্তিপ্রিয়  গোবেচারা  ভালোমানুষের ভেক ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে সজোরে ধাক্কা দেয় । অস্থির করে তোলে মস্তিষ্ক , ভাবতে বাধ্য করে আমরা কি আদৌ এক বিন্দু অগ্রসর হয়েছি ? এ কোন মনুষ্য সমাজ যা শ্বাপদ সঙ্কুল অরণ্যের আদিমতার চাইতেও অনেক বেশী মাত্রায় ভয়ঙ্কর ? ট্রাস্ট নামক কনসেপ্টের কি কোনো অস্তিত্ব নেই ? স্বার্থ সিদ্ধি না হলে বরং বলা ভালো আঁতে ঘা লাগলে যে কোনো মুহুর্তে অতি পরিচিত মুখটিও হয়ে উঠতে পারে রক্ত পিপাসু ?

মালতী নামের মেয়েটি স্কুল পড়ুয়া, সে মেয়েদের স্কুলে পড়ে । ঘরে তার বাবা মা আর ছোট ভাই আছে । হাসি খুশী প্রাণোচ্ছল মালতী রোজ স্কুল ছুটির পর বান্ধবীদের সঙ্গে নির্দিষ্ট পথে বাড়ী ফেরে । পাশেই ছেলেদের স্কুল , একই পথে আসা যাওয়া করে রাজেশ । সমবয়সি ঐ তরুনের হৃদয়ে দোলা দেয় মালতী , সে তার হাত থেকে কেড়ে আচার নিয়ে খায় , অকারণ পুলকে হাসিতে ভরিয়ে তোলে বিকেল গুলো । এদিকে মালতীর রূপ লাবণ্য যে বশিরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তার খোঁজ মালতীর জানা ছিল না । হঠাই একদিন বশির অতর্কিতে রাজেশকে আক্রমণ করে । বশির সাফ জানিয়ে দেয় রাজেশের সঙ্গে মেলামেশা করা তার না পসন্দ । তত দিনে মালতী পড়া ছেড়ে কাজে যুক্ত হয়েছে , কারণ তার ইচ্ছে সে একজন পারফর্মিং আর্টিষ্ট হবে।  ও দিকে রাজেশ আর এক ধাপ এগিয়ে মালতীর হাতে লাল গোলাপ তুলে দেয় । অক্ষম আক্রোশে ফুঁসে ওঠে বশির , তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে । একদিন মালতী কর্ম স্থলে পৌঁছাবার আগে তার ওপর এসিড ঢেলে দেয় । মুহূর্তে বদলে যায় মালতীর জীবন । সেই অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ভয়ঙ্কর অভিঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে যায় সে ।

লড়াইয়ের শুরু এইখান থেকেই । সুদীর্ঘ এক দশকের আইনি লড়াই শেষে সুবিচার মেলে তার । এই চলার পথে একটি শক্ত পোক্ত কাঁধের সন্ধান পায় যেখানে নিশ্চিন্তে মাথা রাখতে পারে সে , নাম তার অমল , এন জি ও চালায় । যারা স্পেশালি এসিড আক্রান্তদের নিয়েই কাজ করে । মালতী ওই সংস্থার কর্মী হয়ে কাজে যুক্ত হয়।  অমল সদা সর্বদা সতর্ক থাকে পাছে মালতীর প্রতি তার হৃদয়ে চেপে রাখা দুর্বলতা কোনো ভাবে বাইরে প্রকাশ না পায় । মালতী স্পষ্ট ভাষায় বলে হোক না একতরফা তবু তার ভালোবাসা নির্ভেজাল ও প্রত্যাশাহীন । কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমল ধরা দেয় মালতীর বহু বন্ধনে , উভয়ে ঠোঁটে ঠোঁট রাখে । 

এ ছবির পাঠোদ্ধারে সামনে উপস্থিত হয় এমন অনেক প্রশ্ন অথবা চিন্তা যা আইনের মূল ভিত্তি নিয়েই সংসয় প্রকাশ করে । ধর্ষনের সামনে এসিড অ্যাটাক কি নেহাতই তুচ্ছ ঘটনা?  কেঁপে ওঠে চেতনার স্তর । প্রকাশ্যে আসে সেই চিরাচরিত বাঁধা ছকের অবস্থান । নির্যাতিতার দিকে আঙুল তোলা । তা সে  রেপ হোক বা এসিড অ্যাটাক । আবার অন্য দিকে আদালতের দরজায় কড়া নাড়তে গিয়ে একাধিক বিচিত্র ও রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় মালতী ও তার আইনজীবীকে । ইন্ডিয়ান পেনাল কোড অনুযায়ী এসিড হামলা ও গরম দুধ নিয়ে হামলা আইনের চোখে অপরাধ হিসাবে সমান কিংবা বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ এমনটা নয় । তাই খোলা বাজারে এসিডের মতন ভয়ঙ্কর বস্তুর সহজ লভ্যতা বন্ধের জন্য একটি ভিন্ন লড়াই শুরু করতে হয় । 

লড়াই লড়াই লড়াই … হতোদ্যম বিধ্বস্ত ক্লান্ত জর্জরিত মালতী প্রতিদিন প্রতিনিয়ত জীবনকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করে । রাজেশ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মালতীর সাথে তার সম্পর্ক। ছোট ভাইয়ের টিবি রোগ ধরা পড়লে মেয়ের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক যেন শুধুই লেনদেনের পরিমাপ। মা জানতে চায় মালতী মাসের শেষে স্যালারি পেলো কিনা ? উত্তর আসে হ্যাঁ , মা ফোন রেখে দেয় ব্যাস ।  প্রেমহীন বিশ্বাসহীন এই কংক্রিটের জঙ্গলে দিবানিশি কাটে কি আশ্বাসে ? 

ঠিক এই অন্তর্লীন মনোজগতের আলো আঁধারি গলিপথে চলতে চলতে পরিচালক পৌঁছে যেতে চেয়েছেন এক  ভিন্নতর মাত্রায় এক ভিন্নতর উপলব্ধির স্তরে । সেই চূড়ান্ত মুহূর্তটি ! কি বিষম শ্বাসরোধকারি । হামলা হচ্ছে নিরীহ মেয়েটির মুখে আর স্কোরিং এ বেজে চলেছে অরিজিৎ সিং এর মেদুর মোলায়েম মেলোডি : এক চেহারা গিরা জ্যাসে মহরা গিরা জ্যাসে ধুপ কো গ্রহণ লগ গ্যায়া , ছপাক সে পহচান লে গ্যায়া । তুলনাহীন যাকস্টাপজিশন ব্যবহার আর অসাধারন তার নৈপুণ্য । হামলা ও পুলিশি তদন্তের অব্যাবহতি পর থেকেই মনে হতে শুরু করে যে পরিচালক বোধহয় দ্বিতীয় একটা নিউটন কিম্বা ডেলহি ক্রাইমস তুলে ধরতে চাইছেন না । রাজনীতি সমাজ স্টেটমেন্ট অফ্ ফ্যাক্ট মিডিয়া ওয়ারল্ড ব্যুরক্রেসি আইন ব্যবস্থা এই সব কিছুকেই বুড়ি ছোঁয়া করে শেষ পর্যন্ত রোম্যান্টিক পেলবতায় আশ্রয় খুঁজে নিতে চান তিনি । ক্যামেরা কখনো অতিরিক্ত অস্থির লাগে না । কোনো গিমিক নেই  , বাহুল্য বর্জিত কন্টেম্পরারি লুক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বজায় রাখা হয় । পয়েন্ট অফ্ ইন্টারেস্ট হিসাবে সেই হামলার ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা হয় সব শেষে । সাসপেন্স অফ্ ডিসবিলিভ থেকে ক্লেয়ার ভয়েন্স ; ক্ল্যাসিকাল ফিল্ম মেকিং ফরম্যাটে ভরসা রেখেই মেঘনা দর্শককে চিন্তায় মগ্ন করেন । নিছক বিনোদন কখনই সিনেমার চরিত্র হতে পারে না তার স্বপক্ষে সাওয়াল করে এই ছবি । তাঁর কনভিশন যে স্পষ্ট তাতে কোনো সন্দেহ নেই ।

গোটা ছবির সম্পাদনা যে চিত্রনাট্য রচনার সময় থেকেই সেরে ফেলা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না । নির্মাণের কৃত-কৌশলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে প্রতিটি বিভাগ তাদের সেরাটি উপহার দিয়েছে ।  মেঘনার মুন্সিয়ানা এইখানেই ; মালতী ও বশিরের সম্পর্ক যা কিনা সাংঘাতিক স্পর্শ কাতর যা থেকে আগুন জ্বলতে পারে  তাকে কমিউনাল অ্যাঙ্গেল তৈরী হতে দেননি মেঘনা , সযত্নে এড়িয়ে গেছেন বিতর্ক ।   

এ ছবির ইউ এস পি দীপিকা পাডুকোন তা অনস্বীকার্য । কিশোরী বেলা থেকে পরিণত নারী স্বত্তায় উত্তরণ সুনিপুণ অভিনয় দক্ষতার পরিচয় রেখে যায় । নিজের স্টার্ডামকে গোপন করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মালতী হয়ে ওঠা খুব যে সহজ নয় তা বলাই বাহুল্য । কিন্ত সেই কঠিন কাজটিই করে দেখিয়েছেন দীপিকা । হিন্দি বানিজ্যিক ছবির গ্যমার গার্লকে দেখে অভ্যস্ত দর্শকদের চোখে ধাঁধা লাগতে পারে , মনে হতেই পারে আচ্ছা এমন কিছু সাংঘাতিক কাজ কি সে করল !? আসলে মুশকিল এখানেই , অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে মন ভরে কি ? অতি সংযত নিচু তারে বেঁধে রাখা ব্যবহারবাদীক মাপা  পারফরম্যান্স আলো বাতাসের মতনই সহজলভ্য হয়ে যায় । অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার নিরুচ্চারিত অভিব্যক্তি ও অভিমানী চোখ জোড়া হৃদয় এফোঁড় ওফোঁড় করে । প্রশ্ন করতে ইচ্ছে জাগে আমরা কয়জন খুব কাছ থেকে দেখেছি চিনেছি এই ধরনের ভিক্টিমকে । স্বাভাবিক আর পাঁচ জন মানুষের মতন সব অনুভূতির প্রকাশ এদের ক্ষেত্রে কি রকম তার কোন স্পষ্ট ধারনা আছে কি আমাদের ? তাহলে হামলা পরবর্তী দীপিকার প্রস্থেটিক মেকআপ নেওয়া এক্সপ্রেশনের যথার্থ বিচার করা এতো সহজ কি করে হতে পারে ?  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ছপাক তৈরী হয়েছে লক্ষ্মী আগরওয়ালের জীবনের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে । লক্ষ্মীর জন্ম ১৯৯০ সালের ১লা জুন । ২০০৫ সালে ১৫ বছরের লক্ষ্মীর মুখে এসিড হামলা করে ৩২ বছর বয়সি নাঈম খান । কারণ সে নাঈমের প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল । আর পাঁচ জন আক্রান্তের সঙ্গে ঘটনাটি ধারাবাহিক ভাবে হিন্দুস্তান টাইমসের পাতায় প্রকাশিত হয় । তার লড়াই শুরু সেই থেকেই । তৃণমূল স্তর থেকে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশব্যাপী আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠে অচিরেই । তার সংগ্রামের ফল স্বরূপ সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র সরকার তথা সব রাজ্যের সরকার গুলিকে এই মর্মে আদেশ জারী করতে বাধ্য হয় যে তারা যেন অবিলম্বে এসিড বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হন এবং সেই সঙ্গে পার্লামেন্ট যেন এমন আইন প্রণয়ন করে যাতে হামলাকারী সহজে ছাড়া না পায় ও তার কঠিন সাজা হয় । এনজিও তৈরী করে আক্রান্ত মেয়েদের রক্ষা করা লক্ষ্মীর জীবনের সংকল্প ও ব্রত হয়ে ওঠে । ২০১৪ সালে ইউনিসেফ এর পক্ষ থেকে লক্ষ্মী তার কাজের স্বীকৃতি পায় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা তাকে সম্মানিত করে ইন্টারন্যাশনাল ওমেন অফ্ কারেজ এর মাধ্যমে । ২০১৯ সালে নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক তথা পানীয় জল ও স্যানিটেশন মন্ত্রক কর্তৃক অতুলনীয় সাহসী নারী এই বিশেষ সম্মানে তাকে ভূষিত করা হয় । বর্তমানে ২৯ বছর বয়সী লক্ষ্মী স্বামী অলক দীক্ষিত ও একমাত্র কন্যা সন্তান সহ রাজধানী নয়া দিল্লীর বাসিন্দা।

Facebook Comments

You Might Also Like