চলচ্চিত্র বিনোদন

Maborosi : সবুজ সাইকেল ও অমল আলো – অভিষেক ঘোষ

চলচ্চিত্র সমালোচনা : মাবোরোসি (১৯৯৫)
পরিচালক : হিরোকাজু কোরীদা
দেশ : জাপান

কোরীদার  এই  ছবিটি  তাঁর  অন্যান্য  ছবির  মধ্যে  ভিস্যুয়ালি  সবচেয়ে  সুন্দর  ।  এই  ছবিতে  স্তব্ধ  করে  দেওয়া  দৃশ্যমালা  স্বাভাবিক  ছন্দেই  আসে,  যেমন  শ্রেষ্ঠ  লেখকের  গদ্যে  রত্ন-বাক্য  আসে  অনায়াসে,  ঠিক  তেমনি  । সমুদ্র  যেন কোনো  অলস  বাঁশির  সুরে  ঝিমোতে  থাকে, পাহাড়ি পথগুলো  যেন  পল্লি-বালিকার  মতো  নম্র  অথচ  চঞ্চলা,  বৃষ্টি  যেন  দুষ্টুমি  জুড়ে  দেয়  চলতি  গাড়ির  ঝাপসা  কাঁচের  সাথে,  স্থবির  গাছের  গায়ে  রোদ  লেগে  থাকে  সোহাগে, সবুজ  পাতার অমসৃণ সামিয়ানায়  সাদা  বরফ  ঝরে  পড়ে  যেন মজলিসি  গল্পের  আহ্বানে,  আরো  মজার  কথা  দুঃখমুখী  ধোঁয়ার  কুন্ডলী  আগুন  ছেড়ে  ঊর্ধ্ব-মুখী  হয়  ঠিক আন্দ্রেই  তারকোভস্কির  ছবির  মতো  ।  আর  ক্যামেরা  বিভিন্ন  শটে  বারেবারে  ওজু  (Yasujirō Ozu)-কে  মনে  করায়  ।

এই  ছবির  চরিত্রেরা  স্বল্পবাক,  সংলাপ  প্রায়  নেই,  ক্যামেরা  যেন  সলজ্জ  ভঙ্গিতে  দূর  থেকে, বহু  ক্ষেত্রে লো-অ্যাঙ্গেলে,  তাদের  বিরক্ত  না  করে,  কেবল  লক্ষ্য  করে  ।  কেবল  আলগা  চুল  দমকা  বাতাস  ছুঁলে  অন্যমনস্ক  ক্যামেরা  অগ্রসর  হয়  ।  অভিভাবকের  দু-পায়ের  মাঝে  তপোবন-সম  প্রশান্তিতে,  নির্বিঘ্নে  ঘুমিয়ে  থাকতে  পারে  শিশু,  ক্যামেরা  বা আবহ সঙ্গীত  অনাবশ্যক শব্দ  করে  সহসা  তাদের  ঘুম  ভাঙায়  না  । তাই এই ছবির  চরিত্রগুলির  আবেগ  ভারি  কম  –  কোরীদার  সাম্প্রতিকতম  ছবিগুলির (Shoplifters, Like Father Like Son) ভক্ত  হলে,  যা  আপনাকে  অবাক  করবে  ।  এ  ছবির  নায়িকা, ইউমিকো  (Makiko Esumi) শৈশবে  ঠাকুমার  অগস্ত্য-যাত্রা  আটকাতে পারেনি, প্রেমিক স্বামীর  অকাল-প্রয়াণ  আটকাতেও  সে  ব্যর্থ  হয়েছে  ।  কিন্তু  সে একটিবারও  কাঁদে  নি  –  শুধু  অবাক  হয়েছে  তারুণ্যে  চঞ্চল  মানুষটা  রেল-লাইন  দিয়ে  অত  অন্যমনস্ক  হয়ে  হাঁটতে  গেলই  বা  কেন  ?  উত্তর  মেলে  নি  ।  ইউমিকো  শুধু  স্বামীর  রেখে  যাওয়া  সবুজ  সাইকেল-টার  দিকে  বিষাদ-গেলা  চোখে  তাকিয়ে  থেকেছে,  কিছুটা  হেঁটেছে  একা  । ঐ হেঁটে যাওয়া যেন এক জীবন থেকে আরেক জীবনের দিকে – সাইকেলের চাকা গড়িয়ে যাওয়ার মতো – সবুজ ক্রমে ধুসর ছোঁয়ার মতো । তারপর  চেনা শহর  ছেড়েছে,  বুকে  দুধের  শিশুকে  আগলে  রেখে, অনুতাপহীন  মনে  মেনে  নিয়েছে  দ্বিতীয়  স্বামী  ও  তার  সন্তানকে, নতুন বসতিকেও  । কোথাও  কোনো  সমস্যা  হয়  নি  –  চোখে  কাজল পরা থেকে  অসল  দুপুরের  সঙ্গম  –  সব  আপন  নিয়মেই  হয়েছে  ।  কিন্তু  এত  নিস্তরঙ্গ  কাহিনি  নিয়ে  না  তো  জীবন  চলে,  না  তো  সিনেমা হয়  ।  তাই  ইউমিকো  আরেকবার  তার  পুরোনো  শহরে  ফেরে, মৃত  প্রথম স্বামীর  স্মৃতির  সড়কে  খানিক  পদচারণার  পর,  পৌঁছে  যায়  সেই  কারখানার  গেটে,  যার  সবুজ  কাচের  ওপার  থেকে  কামনা-মুখর নীরব আহ্বানে  কর্মব্যস্ত  স্বামীকে  কতবার  অন্যমনস্ক  করে  দিয়েছে  সে  ।  মন  টানলেই  মনকেমন  –  আর  স্মৃতি  জাগলেই  অন্তর্দহন  ।  ফলে  প্রত্যাবর্তন  সুখের  হয়  না ইউমিকোর  ।  আর  তারই  বিষন্নতা  এরপর  পরিসর  রচনা  করে  বিয়োগ-বিধুর  পরিবেশে  জীবনের  অনর্গল  অবগাহনের  – ‘আলেয়া’-র  মতো  যা  হাতছানি  দেয়  ইউমিকো-কে  ।  শববাহী  মানুষের  মিছিলের  সঙ্গ  নেয়  ইউমিকো,  তার  স্বামী-কে  জানায়  সে  খুঁজছে  সেই  ফেলে  আসা  প্রশ্নের  উত্তর  ।  বিস্মৃতপ্রায়,  গত  দাম্পত্যের  অপমৃত্যুর  কারণ  !  তার  দ্বিতীয়  স্বামীটি  তাকে  সবিনয়ে  জানায়, ‘Phantasmic  Light’  বা,  সেই  অমল  আলোর  কথা,  যা  সুস্থ  মানুষকে  সহসা  হাতছানি  দেয়,  টেনে নেয়  জীবনের  ভুবনডাঙা  থেকে  মৃত্যুর  শোকপুরী-র  দিকে  । আসলে  ‘Maborosi’  শব্দটির  অর্থ-ও  যে  তাই  –  আলেয়া-সম  ‘অমল  আলো’  ! যে আলোর আহ্বানে ইউমিকো সাগর-তটে দিগন্তে এসে আর শুধু একটা শরীর থাকে না – তার দেহ যেন ওপরে আকাশ আর নীচে জমিটাকে একটা দন্ডের মতো উল্লম্বভাবে ধারণ করে – ইহলোক আর পরলোকের শেষ ব্যবধান হয়ে, সাইকেলের দুটি ঘুরন্ত চাকার মধ্যবর্তী অনুভূমিক দন্ডের মতোই ঋজু ও স্থির হয়ে ।

গোটা  ছবি-তে  এই  বিষাদগাঁথাকে গীতিকবিতার  সৌন্দর্যে  পরিবেশন  করেছেন  পরিচালক  Hirokazu  Kore-eda,  নিঃসন্দেহে  তাঁকে  চমৎকার  সঙ্গত  দিয়েছেন, সঙ্গীতে Ming-Chang Chen, সিনেমাটোগ্রাফিতে  Masao  Nakabori, সম্পাদনায়  Tomoyo  Oshima-রা  ।  কিন্তু  ওই  যে,  গীতিকবিতার  আলোচনায়  শৈলী  সংক্রান্ত  পড়াশোনা  এসে  পড়লেই  সুরের  সাধনা  মাঠে  মারা  যায়,  তেমনি  এমন  ছবির  কাব্যিকতার  বাহানা-টুকুর  আলোচনা  করতেই  ভালোলাগে,  তার  যন্ত্রানুষঙ্গ  নিয়ে  যত  কম  কথা  বলা  যায়,  অনুভবের  পক্ষে  ততই  মঙ্গল  ।  শুধু  এটুকু  বলতে  পারি ,  এই  ছবি  একটা  লম্বা  অপেক্ষার  পর  আলো  দেখার  আনন্দের  নয়,  বরং  দীর্ঘ  অবদমনের  পর,  অনেকদিনের  চেপে  রাখা,  গিলতে  থাকা  কান্না-টা সহসা  কেঁদে  ফেলার  আনন্দের (আর সেখানেই ছবির Craft) । অমল  আলোর  শরীরে  শিমূল  তুলোর  মতো  উড়ে  গিয়ে  যা  লেগে  থাকে,  ভোরের  ভিজে  বাতাসের  স্পর্শে  আরেকবার  সজল  হয়ে  উঠবে  বলে,  যে  সজলতা  তাকে  বৃন্ত-চ্যুত  হওয়ার  আগে  শিশিরে  ভেজার  স্মৃতি  ফিরিয়ে  দেবে  ।

আরও পড়ুন >> পাঠকের নোটবুকঃ অমৃতফল (পর্ব ২/৬)

Facebook Comments

You Might Also Like