চলচ্চিত্র বিনোদন

সেরা স্ক্রিনপ্লে অস্কার পেল জোজো : যোগ্যতা নিয়ে উঠল এই কথা

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, একটি আদর্শ বাণিজ্যিক ছবির যা যা গুণ থাকা উচিত, ‘Jojo Rabbit’ সেই সমস্ত শর্ত পূরণ করে। ছবিটা আদতে অনেকখানি আলোর মধ্যে একটুখানি অন্ধকারকে ধরে, আদতে যা ইতিহাসের উল্টো। এই ভালোবাসা-মাখা আদুরে ছবিটির গায়ে, হিটলারের স্বৈরাচারী নাৎসী শাসনকাল বিশ্রী আঁচড়ের দাগ হয়ে লেগে থাকে কোথাও কোথাও — ঠিক যেমন বিস্ফোরণের পর থেকে ছোট্ট জোজোর মুখখানার দশা হয়। মুখপোড়া ইতিহাসের সাক্ষ্য তাইকা ওয়াইতিতি-র ছবিতে ‘ব্ল্যাক কমেডি’ হয়ে যায়। হয়ে পড়ে উদযাপনের মাধুর্যমাখা কুশ্রীতার প্রতি পরিহাস। আর সেই পথে ভিড় করে অজস্র গুরুত্বহীন চরিত্র, আলোর পথে ছায়া ও ছায়ার পথে রশ্মিকণার মিলিত কাটাকুটি খেলা হয়ে। এই যে একটি তিতকুটে ও বহুচর্চিত, সর্বত্র বিজ্ঞাপিত বিষয়কে চিনির ডেলায় পরিণত করে ফেলা, সেটি ইদানিং সমালোচক মহলে যথেষ্ট নিন্দিত ও সমালোচিত একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু তাইকা-র বিশেষত্ব হল, তিনি এত্তখানি হৃদয় দিয়ে সিনেমা বানান এবং তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও উদ্ভাবনী প্রতিভাযুক্ত। ফলস্বরূপ বিষয়টা হয়ে দাঁড়ায় বড়োদের দুনিয়ায় নাবালকত্ব আরোপ। সেটা হাস্যকর বলেই একটা অস্থির সময় সহজেই মিশে যায় অস্থির শৈশবের চপল দেহে। ছবিটা তাই অনেকটাই ‘The Lobster’ (২০১৫) বা, ‘The Trouble with Harry’ (১৯৫৫) গোত্রের। বালখিল্যতাই এই ছবির শক্তি আর তাকে ধারণ করে রাখে উদ্ভাবক পরিচালকের আশ্চর্য কল্পনা ও শিল্প নির্দেশক Ra Vincent-এর কুশলী ভাবনা। হয়তো মনে হতে পারে, অমন ভয়াবহ ট্র্যাজিক সময়পর্ব-কে এতো লঘু করে দেখানোটাই হাস্যকর। কিন্তু ছবিটা এতো অগুন্তি সুন্দর ও গভীর মানবিক মুহূর্ত উপহার দেয় যে, নিতান্ত পাষাণ না হলে, সেই স্রোতে না ভেসে উপায় থাকে না।

জোজো মায়ের সাথে থাকে (মায়ের ভূমিকায় স্কারলেট ‘ব্ল্যাক উইডো’ ইয়োহানসন)। সে জানে বাবা যুদ্ধে গেছে জার্মানির জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়বে বলে। জানে না তার বাবা আসলে রেসিস্ট্যান্স, তার মা রোসি-ও। দশ বছরের জোজো বেৎজলার নিজের জুতোর ফিতেটাও বাঁধতে পারে না, অথচ গোঁড়া ফ্যাসিস্টের মতো হিটলারের প্রতি তার অন্ধ আস্থা। শৈশবের মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে উগ্র জাতিয়তাবাদ। শুধু তাই নয়, তার একমাত্র মোটকু ইয়ার য়োর্কি ছাড়া তাকে সর্বক্ষণ যে সঙ্গ দেয় সে আর কেউ নয়, স্বয়ং অ্যাডলফ্ হিটলার। একটা বাচ্ছার মুখে ‘হাইল হিটলার’ না শুনতে পেলে যার কৃষ্ণ বিরহে রাধার মতো বুকের ছাতি ফেটে যায় যায় অবস্থা হয়। তখন অ্যাডলফ্ (ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড) অভিমানে ঠোঁট ফোলায়। জোজোর সময়, স্বদেশ, পরিবেশ-পরিস্থিতি তাকে পাখি পড়া করে শেখায় জাতির গৌরব। শেখায় ইহুদিরা ভয়ংকর বাজে, ওরা হাট্টিমাটিম-টম, ওদের মাথায় দুটো শিং — ওরা মাইন্ড কন্ট্রোল করতে পারে — ইচ্ছেমতো পারে রূপ বদলাতে — যাচ্ছেতাই খায় আর পোকার মতো নরকের গর্তে বাঁচে। বলাই বাহুল্য এ দেশে শিক্ষাকে বহন করাই রীতি, বাহন করা নয়। জোজোও তাই সাপ্তাহিক ক্যাম্প প্রশিক্ষণে যাওয়ার আগে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলে, তার সর্পতুল্য ঠান্ডা মাথা, নেকড়েসদৃশ শিকারী স্বাপদ দেহ। কিন্তু ক্যাম্পে গিয়েই সে যে নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়, পালাবার পথ পায় না। জ্যান্ত খরগোশের ঘাড় মটকাতে বলা হয় তাকে। পারে না জোজো। সকলের তীব্র বিদ্রূপে তার নামই হয়ে যায় ‘Jojo Rabbit’, যে খরগোশের মতো ভীরু। কল্পনায় হিটলার তাকে বোঝায়, গাজর খুঁজে এনে এই খরগোশই কিন্তু পরিবারের মুখে অন্ন জোগায়। অনেকটাই শক্ত কাজ সেটা। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে কীভাবে দৃশ্যে দৃশ্যে অন্তর্ঘাত ঘটে ছবিতে।

ছবির সংলাপে কোনো গিমিক নেই, আছে বুদ্ধির ঝলক। ক্যাম্পে নাবালকদের ট্রেনিং-এ শেখানো হয় চাকু চালানো, গুলি-গোলা ছোঁড়ার মতো গৌরবময় কাজ, যা ছদ্ম পৌরুষের গায়ে চিমটি কাটে। আর মেয়েরা বা, নাবালিকারা কী শিখবে ? সংলাপ আছে — দেশের এই গৌরবের দিনে সবচেয়ে পবিত্র ও মহান কাজ — কীভাবে অসংখ্য সন্তানের জন্ম দিতে হয়, যারা দেশের জন্য লড়বে – তাই শিখবে। বলাই বাহুল্য সন্তান অর্থে পুং। এদিকে বেচারা জোজো সেই মিথ্যে পৌরুষের ঝোঁকে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়তে গিয়ে মুখ পোড়ায়। ঠিক যেমন সভ্যতার মুখ পুড়িয়েছিল নাৎসীরা।

জোজো জানতো না, তার পরলোকগতা দিদির অভাব পূরণ করতে তার মা বেছে নিয়েছে দিদিরই বান্ধবী এলসা-কে। রোসি তার জননীসত্ত্বার পূর্ণ স্বাদ পেতে চায় পরলোকগতা কন্যার সমবয়সী এলসা (যাকে ইহুদি বাবা-মা স্টেশনে ফেলে রেখে যেতে বাধ্য হয়)-র বেড়ে ওঠা চোখের সামনে দেখার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে অন্তর্ঘাত হল মেয়েটি ইহুদি এবং জোজোর নিজের মা এই কাজে জড়িত; জোজোর চোখে তার অস্তিত্ব তখন বিপন্ন হয়ে পড়তে চলেছে। সত্য আবিষ্কারের পর জোজো যখন তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্বে মথিত হচ্ছে তখনই সে প্রথমবার ঐ মেয়েটির প্রেমে পড়ে। এই মজাটা অব্যক্তই থাক, ছবিতেই দেখা ভালো। মায়ের কথামতো জোজো অনুভব করে পেটের মধ্যে অগুনতি রঙিন প্রজাপতির রামধনু বুদ্বুদ। জোজো তাকে বলেছিল, আঁকো তো দেখি সেই জায়গাটার ছবি, যে নরকে থাকে নোংরা সব ইহুদিরা। মেয়েটি জোজোর টুটিফুটি মাথার ছবি আঁকে। অবাক জোজো রেগে বলে, এসব কী ? মেয়েটি জানায়, এই সেই জায়গা, যেখানে আমরা থাকি। সত্যি জাতি-বিদ্বেষ মস্তিষ্কের বিকার ছাড়া আর কি ! চমৎকার সংলাপ। জোজোর পেটে—মাথায় যখন প্রেমের অ্যাকোয়ারিয়ামে কিলবিল করছে কল্পনার মাছ, তখনই তার মায়ের প্রকৃত পরিচয় সে জানতে পেরে যায়। চাবুকের দাগ মেলাতে না মেলাতেই একদিন গেস্টোপোদের নির্মমতার সড়কে, প্রেম-কল্প প্রজাপতির পিছু ধাওয়া করতে করতে,  সে উপর থেকে ঝুলতে দেখে একজোড়া পরিচিত জুতো। দর্শক অভিঘাতে বিহ্বল হয়ে পড়তে পারেন — এইজন্যই যত্রতত্র ছবির নানান দৃশ্যে তাইকা ঐ জুতোজোড়া দেখিয়েছিলেন। এভাবেই একজোড়া জুতো মৃত্যুর পাশবিকতা নিয়ে হাজির হয়, মানুষটিকে দেখাতে হয় না আর। ছবিটা শেষ হয় রাশিয়ার জার্মানি বিজয়ের পর সম্মিলিত শোভাযাত্রার মধ্যে অবশেষে সম্বিৎ ফিরে পাওয়া জোজো ও এলসার পথে বেরিয়ে আসার মধ্যে দিয়ে। তারা স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ে — সেই তো সত্যিকারের স্বাধীনতা — চার্লি চ্যাপলিনের ‘Modern Times’ (1936)-এর শেষ দৃশ্যের মতো। এখানে যদিও তারা পথে এসে নাচতে থাকে – ঐ যে উদযাপন। আর এভাবেই কল্পবিশ্বে নাবালকত্বের সুতো মিলে যায় অজ্ঞানতা ও অন্ধকারের শিকল থেকে মুক্তির নৃত্যে। আহা যেমন উজ্জ্বল সব রঙ, তেমনি সব ছবির মতো সুন্দর (!) সব ফ্রেম।

সত্যিই তো, ভালোবাসা মানে কখনো সখনো ছেড়ে চলে আসা….। সেই প্রস্থানের কাহিনিই পরম মমত্বে দেখায় ‘Jojo Rabbit’। Taika Waititi-র অভিনয়ে জোজোর কল্প-বন্ধু তুলতুলে Adolf Hitler এই ছবির সবচেয়ে বড়ো পাওনা। তিনি অসামান্য, অনবদ্য। অভিনয়ে জোজো (Roman Griffin Davis, আদতে তারা তিন জমজ ভাই, বৃহৎ এক শিল্পী পরিবারের সদস্য), ইদুদি কিশোরী এলসা (Thomasin McKenzie), ক্যাম্প ক্যাপ্টেন Captain Klenzendorf (Sam Rockwell)-এর চরিত্রাভিনেতারা অনবদ্য। মা-এর চরিত্রে Scarlett Johansson-এর সেভাবে সুযোগ ছিল না। তাও তিনি সপ্রতিভ, সুন্দর। Christine Leunens-এর লেখা ‘Caging Skies’ বইটি থেকেই সিনেমার ভুবন নির্মিত হয়েছে। Michael Giacchino-র সঙ্গীত, Tom Eagles-এর সম্পাদনা ও Mihai Mălaimare Jr. (‘The Master’-খ্যাত)-এর সিনেমাটোগ্রাফির যোগ্য সঙ্গতে এই ছবি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত উপভোগ্য ও বুদ্ধিদীপ্ত বানিজ্যিক ছবি, ঠিক যেমনটির আজ বড়োই প্রয়োজন। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম, —-

এতসব পেরিয়ে এসে,
ছবির শেষে,
ছোট্ট জোজো অবশেষে,
জুতোর ফিতে বাঁধতে শিখে যায়।
অর্থাৎ জোজো এবার বড়ো হয়ে গেল ….।

Facebook Comments

You Might Also Like