চলচ্চিত্র বিনোদন

চাউমিন, চিলি ফিশ আর নাটকীয় চুমু-র ছবি দ্বিতীয় পুরুষ

 চাউমিন আর চিলি ফিস একসাথে খেতে নেই । বদভ্যাস …. 

ক্রাইম থ্রিলার বানাতে গেলে যে যৌক্তিক পরম্পরা ও আবহনির্মাণে গাম্ভীর্যের প্রয়োজন, বাংলা সিনেমায় তা কেবল দুর্লভ-ই নয়, নেই বললেই চলে । আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয়, বিশ্ব বাজারে বাংলা সিনেমা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে বসে আছে ! মিশ্র সংস্কৃতি বিনোদনে যে পঙ্কিল অপরিচ্ছন্নতা এনে দিয়েছে, তাই আজ আমজনতার কাছে ‘ঝক্কাস’ ! মৌলিকতা বলে কোথাও কিছু নেই । ফলস্বরুপ অগভীর চিত্রনাট্যে ভাসে কুযুক্তির শ্যাওলা আর থ্রিলারে অহেতুক ভীড় করে শুকনো পেঁয়াজকলির মত প্রেম । সৃজিতের বিগত কয়েকটা সাক্ষাৎকার দেখলে উপলব্ধি হয়, ওনার কাছে সিনেমা-টা আর্ট বা, কোনো গুরুতর বিষয় নয় । ওনার কোনো দর্শন নেই । নেই কোনো স্থায়ী বিশ্বাস । উনি নিজেই নিজেকে সিরিয়াসলি নেন না, তো আমরাই বা কেন অযথা বেশি গুরুত্ব দেব ? মুশকিলটা আসলে বাঁধিয়েছি আমরাই – ‘বাঁশ বনে শিয়াল রাজা’- কে নাগালে পেয়ে বাংলা ছবির ভাঙা আটচালায় তাঁকেই নাগাড়ে ‘ফার্স্ট বয়’ বলে আহ্লাদ দেখিয়েছি । আর ভক্তকুল-ও সমানে তাঁকে ‘গরীবের নোলান’ – ভেবে হেব্বি তোল্লাই দিয়েছে । আর তিনিও একের পর এক ছবি-তে ঝুলিয়ে গেছেন । আমরা নিজেদের শিক্ষিত করে তুলি না এবং বছরের পর বছর একই পচা মালে সন্তুষ্ট থাকছি বলেই আজ আমাদের ছবির কোনো নিজস্বতা নেই, বিশ্বাসযোগ্যতা নেই । আরো ভয়ংকর ব্যাপার – কোনো বাজারও নেই । যাক সে কথা – এ বার দেখে নেওয়া যাক্, আমাদের প্রিয় সিজিদ্দা নতুন ছবিতে কী কী হাটুরে বিস্ময় নিয়ে এলেন,  গিমিকের গুঁতোয় আমাদের পিলে চমকে  দেবেন বলে ।

এ ছবির কাহিনিকার শুভঙ্কর ব্যানার্জি ও সৃজিত নিজে । সঙ্গীতে যথারীতি অনুপম রায় ( একটি গান বড়ো মিষ্টি মানতেই হবে — কেবল ডার্ক থ্রিলারে এত মিষ্টি বেমানান – এই যা )! সিনেমাটোগ্রাফিতে সৌমিক হালদার, ট্রামের তারে আটকা ঘুড়ি । সম্পাদনায় প্রণয় দাশগুপ্ত । আপনি এ ছবি দেখার আগে একটু  ‘District B 13 : Ultimatum’ (২০০৪) নামের ফ্রেঞ্চ ছবিটা দেখে নিন । দেখুন  মাত্র ৫ মিনিটেই কীভাবে এই ধরণের ছবির প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিতে হয় । আসলে এডিটরের দোষ নেই, যা মাল-মশলা পরিচালক তুলে নিয়ে আসেন ক্যামেরায়, তাতে ঐ আলুনি রান্নাই হয় । ‘দ্বিতীয় পুরুষে’র প্রতিটি  পিছু ধাওয়ার দৃশ্য, হত্যার নির্মম দৃশ্যগুলো, শুরুর খামখেয়ালি জঘণ্য পাঁচ মিনিট – এতটাই নিম্ন মান ও মেধার যে, টিকিটের টাকা ফিরৎ চাইতে ইচ্ছা করে । তার ওপর প্রেম — একটা নয়, দু-দুটো ।

পরমব্রত-র অভিজিৎ পাকরাশি ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ ছিল গোবেচারা । Bournvita খেত তখন । এই ছবিতে ৮ বছরের অভিজ্ঞতায় সেও পেকে আঁটি হয়ে গেছে । পরমব্রত দুর্দান্ত কাজ করেছেন । অসম্ভব গোলমেলে, ভিত্তিহীন একটা চরিত্রের যুক্তিহীন, অনৈতিক ট্রান্সফরমেশন-কে তিনি সাবলীল দক্ষতায় ধরেছেন । প্রবীর রায়চৌধুরির আত্মা যেন তার ওপর ভর করেছিল — তাও মেনে নেওয়া যেত, কিন্তু পরিচালক মশাই তাঁর অভিজিতের চরিত্রকে নিয়ে শেষে যে আরোপিত গিমিক ট্যুইস্ট-টি চাললেন, তা ওনার নিজেরই প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের ভিত্তি নড়িয়ে দিল । হয়তো এটাই দরকার ছিল । এভাবেই উনি নিজেই একটা ভ্যালিড রিজন দিলেন, ওনাকে ও ওনার অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসন-কে এবারে রিজেক্ট করার । সৃজিত বেপরোয়া এবং মাতব্বর হয়ে উঠেছেন । তাঁর ছবির টাইটেল কার্ড-এ শুরুতে ছবির নাম দেখানোর সময় ‘দ্বিতীয়’-শব্দের সাবটাইটেলে ‘other’ শব্দের সংযোজন লক্ষ্য করলেই, যে কোনো আদার ব্যাপারী ক্লাইম্যাক্সের ফুটো জাহাজের খোঁজ পেয়ে যাবে । এর বেশি আর বলবো না, বললে দেখার মজা (আদেও আছে !) নষ্ট হয়ে যাবে । ছবিতে রজতের খুন হওয়ার দৃশ্যটি ছাড়া কোথাও এতটুকু থ্রিল্ নেই ।অভিনয়ে ঋতব্রত ও সোহম-কে বেশ তাজা লাগে – ছবিটা কেবল ওদের দুজনকে নিয়েই হতে পারতো – হলে বলা যেত, সৎ ছবি ।

গল্পটা সরল – একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে, একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে একের পর এক খুন হচ্ছে । পুলিশের বড়ো অফিসারের কাজ খুনী ও খুনের মোটিভ – দুইই খুঁজে বের করা । আর তা করতে করতে এবং টলোমলো প্রেম সামলাতে সামলাতে কোন সত্য উদ্ঘাটিত হয়, তা নিয়েই ছবির গল্প ।  অনির্বাণ ভট্টাচার্য ‘খোকা’ নামে খুন করে বেড়ান ও পাশবিকতা উপহার দেন । জানা যায়  তিনি পঁচিশ বছর জেল খেটে এসেছেন । তো তাঁকে ভয়ংকর বানাতে গিয়ে এমন বোনলেস মোরগের মতো সাজিয়েছেন সৃজিত, যা হাস্যকর । আর পুলিশগুলো কি বোকা কি বোকা ! একই লোকেশন কেন খোকা গুন্ডা বেছে নেয়, প্লটে তার যথেষ্ট যুক্তি আছে । “স্মৃতি তুমি এত প্রতারক !” — সুনীল গাঙ্গুলি মনে পড়বে ! কিন্তু মুশকিল হল, ঐ পুণঃপুনঃ  একই লোকেশন আর ট্র্যাপ — আজকের যুগে ‘দেখানোর মুন্সিয়ানা’ বা, ক্যামেরার  সুচতুর অভিনব কোণ না থাকলে, এ ধরণের দৃশ্য ক্লান্ত করে । তো খোকা খুন করে সিগনেচার করে চলে ও তার নেচার বোঝাতে সিরিয়াল কিলিং-এ উইকিপিডিয়া হয়ে ওঠেন অভিজিৎ । তাঁর শিষ্যও জুটেছে — রজত (গৌরব চক্রবর্তী) । তো বাইশে-তে গুরু নিজেকে মেরে ছবি হিট করিয়েছিল ট্র্যাজেডির জোরে । এখানে শিষ্য আগেভাগে মরে গেল ! যাহ্ কলা ! তাও ঠিক ছিল — কিন্তু তারপর কি নাটক ! রজতের গার্লফ্রেন্ড অঙ্কিতা (ঋদ্ধিমা ঘোষ) এমন হাসতে লাগলো আঘাত পেয়ে যে, পাব্লিকও হেসে ফেললো ! অভিজিৎ তারপর বমি করলো । পরে বুঝবেন, ঐ দৃশ্যটাই অবান্তর । এদিকে প্রসেনজিৎ অভিনীত কাল্ট খ্যাপা চরিত্র প্রবীর (বাইশে শ্রাবণ)-এর দাদা গজিয়ে গেছে — তিনি প্রণব রায় চৌধুরি (অভিনয়ে মাননীয় বাবুল সুপ্রিয়) । তিনিও ব্রাদার-সম খ্যাপা । পিটিয়ে পা ভাঙেন । ঐ জেলখানাতেই ঘটে যায় থ্রিলারের সবচেয়ে বড়ো থ্রেট — আগাপাশতলা গাঁজাখুরি একটি কুযুক্তি । যার ওপর নির্ভর করলে আপনার আর দ্বিতীয়বার এই ছবি বা, বাইশে শ্রাবণ — কোনোটাই দেখতে ইচ্ছে করবে না ।

এই ছবির আরেক দুর্বল জায়গা রাইমা-পরম-আবীরের ত্রিকোণ হালিম-প্রেম । ডাল-ভাত আর বিরিয়ানি দুটোই খেতে গিয়ে রাইমা অভিনীত অমৃতার যে ভুঁড়ি দেখা গিয়েছে, তা যথেষ্ট দৃষ্টিকটুভাবে পর্দায় এনেছেন সৃজিত । উনি এগুলোকে বাহাদুরি ভাবেন — যেমন ঐ শেষ দৃশ্যের চুমুর নাটকীয় কালাপাহাড় — বা, ঐ জিমি-র চরিত্রে শুভ্র সৌরভ দাসের কমিক্যাল এস্ট্যাবলিশমেন্ট । ‘সংলাপ’ সৃজিতের অন্যান্য ছবির মতোই ওভারস্মার্ট, সিন্থেটিক ও অতিনাটকীয় । একটা ভালো ছবির অত পাঞ্চ লাইনের দরকার হয় না — তার গল্প ও বলার কৌশল-ই যথেষ্ট । কিন্তু ঐ যে গরীবের নোলান — তাই জ্যাকেট পরে কাঁধে গামছা ঝোলান । মানাচ্ছে না তো কি ? কেতা তো হোলো । তাই পুলিশ অফিসারের বিরহী স্ত্রী ডিভিডি চালিয়ে দরজা-টরজা হাট করে খুলে রেখে মাঝরাতে বেডরুমে পড়ে থাকেন ! মানুষ বদলে যায় মুহূর্তে । আট বছর ধরে অভিজিৎ বাথরুমে শাওয়ার লাগাতে পারে না । বালতি আর মগের জলে শ্যাম্পু সারে । তাই ‘চাউমিন আর চিলি ফিশ’ একজন জাতীয় পুরস্কার-জয়ী পরিচালকের ছবির প্রতীকী ট্যুইস্ট হয়ে ওঠে । এক-টাকার কয়েন-টা উল্টে যাচ্ছে সৃজিত ! আজ মানুষের হাতের মুঠোয় বিশ্ব সিনেমা । এবার অন্তত বারো দিনে শ্যুটিং সারার কমার্শিয়াল চালাকি ছেড়ে মন দিয়ে চিত্রনাট্য-টা লিখুন । আমরা বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়াতে চাই । চাই সিঙ্গল স্ক্রীনগুলো চলুক । চাই সোহম মৈত্র-র মতো নতুনরা সিংহভাগ সুযোগ পাক । চাই অনির্বাণের মত অভিনেতারা এসব ছদ্ম-থ্রিলারের মোহজাল থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকার যুগান্তকারী কাজ করুক । আমরা অপেক্ষা করছি সৃজিত — আপনারা তৈরি তো !

Facebook Comments

You Might Also Like